ঢাকা এবং এর চারপাশে শুধু দূষণ আর দূষণ

এ ব্যাপারটি বোধ হয় নতুন কোনো টপিক নয় – ঢাকা আর এর চারপাশের এলাকা যে দূষণের ভারে ন্যূজ্ তা সবারই জানা। তারপরও বিষয়টিকে নিজের মতো করে উপস্থাপনের তাগিদ থেকে সরে আসতে পারলাম না। এর কারণ এই যে, এই পড়ন্ত বিকেলে লাঞ্চের পর একটু ঘুমের ইচ্ছে ছিল, সেটা পারলাম না শব্দ দূষণের কারণে। যেখানে অবস্থান করছি সেটা আমার পিতা-মাতার আবাসস্থল, অামি বউ-বাচ্চা নিয়ে অন্যত্র থাকি।

এখানে প্রতিবেশী যে পরিবারটি এই ক্রমাগত শব্দ দূষণ (ফার্নিচার টানাটানির শব্দ) চালিয়ে যাচ্ছে, তারা যে ব্যাপারটা ইচ্ছে করেই ঘটাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। হয়তো আমার মা আপাতত কয়েকদিনের জন্য ঢাকার বাহিরে আছেন, তাই তারা এটা করার সাহস পাচ্ছে। অথবা ওনারা হয়তো এই ব্যাপারটিতে অভ্যস্থ হয়ে গেছেন। তবে আমি কিছুতেই শব্দ দূষণ সহ্য করতে পারি না, আমার কান বোধ হয় সাধারণের তুলনায় একটু বেশি সংবেদনশীল। সেটা হতেই পারে, আমি যেহেতু দীর্ঘদিন ইংরেজিতে লিসেনিং স্কিল বাড়ানোর জন্য চেষ্টা চালিয়েছি এবং তাতে প্রায় ৯৫% পর্যন্ত সফলকামও হয়েছি।

এ পর্যায়ে কিছু লোক প্রশ্ন তুলতে পারেন, প্রতিবেশী পরিবার কেন অপ্রয়োজনীয় শব্দ দূষণের মাধ্যমে বিরক্তির কারণ হবে, কী ঠেকা পড়েছে তাদের? আসলে আমাদের দেশে কিছু লোক যে অন্যের বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়ে মজা পায়, সেটা বোধ হয় কারো অজানা থাকার কথা নয়। আর সত্যি কথা বলতে গেলে, এজন্য আমি নিজেও খানিকটা দায়ী। প্রথম যেদিন এখানে এসেছি (তিন-চার দিন আগে), সেদিন প্রায় ঘণ্টা দুয়েক ধরে হাই ভলিউমে সাব-উফার বাজিয়েছি। ব্যাপারটি পাশের বিল্ডিংএর এক ভদ্র (নাকি অভদ্র!) মহিলা ভালো চোখে দেখেন নি মনে হয়, যেটা তার সাথে তাৎক্ষণিক আই কনট্যাক্ট এর মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলাম। তিনিই হয়তো তার সাধের কোনো বান্ধবী টাইপের ফ্যামিলিকে দিয়ে ফার্নিচার টানাটানির কাজটা করাচ্ছেন। আমার মা চলে আসলেই হয়তো তারা রণে ক্ষান্ত দিবেন, অথবা আমি চলে গেলে।

যাই হোক, দূষণের কথায় ফিরে আসি। এর আগে একটা বাসা বদলাতে হয়েছে এই প্রকার দূষণের কারণে। উপরের নোয়াখাইল্লা ব্যাচেলররা সারা দিন-রাত এত ধুপধাপ করতো যে, আমার বা আমার বাচ্চার শান্তিমতো ঘুমানোটা অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। এমনকি এখন যে বাসায় থাকি, সেখানেও প্রতিবেশী পরিবারে বাবা-মার উসকানির চোটে দুটি শিশু বালক দরজা ধাক্কাধাক্কির মাধ্যমে এতটা শব্দ দূষণ ঘটাচ্ছে যে, মনে হয় এখান থেকেও চলে যেতে হবে।

এবার আসি বায়ু দূষণের কথায়। বাসার পাশে যদি পান-সিগারেটের দোকান থাকে, তাহলেই হয়েছে। এর আগে আমি যে বাসায় ছিলাম, সেটা অনেক সুন্দর ছিল – টাইলস, থাই গ্লাস, সবকিছুই হাই-ফাই। কিন্তু সমস্যা ছিল পাশে রিকশার গ্যারেজ আর পান-সিগারেটের দোকান। আমার বাসাটা ছিল তিন তলায়, তাই কী পরিমাণ ধোঁয়া যে জানালা দিয়ে প্রতিনিয়ত ঢোকার চেষ্টা করতো সেটা মনে পড়লে এখনো গা শিউরে উঠে।

বায়ুদূষণে টিকতে না পেরে সে বাসাটা ছেড়েছিলাম, বাড়িওয়ালা বুঝতে পারলেও তার কিছুই বলার ছিল না। তারপর নিশ্চয়ই মনে আছে চিকনগুনিয়ার কথা। এই অসুখ তথা মশার ভয়ে লোকজন সন্ধ্যা হলেই যা হাতের নাগালে পেত, তাই পোড়াতো, এমনকি প্লাস্টিকও। প্লাস্টিক বা পলিমারের ধোঁয়া যে দেহের বিশেষ করে শিশুদেহের কী পরিমাণ ক্ষতি করে তা বলাই বাহুল্য। সবচেয়ে আতংকের কথা হচ্ছে, কিছু কিছু লোক শুধুমাত্র অন্যকে বিরক্ত করার উদ্দেশ্যে এ সকল দূষণ কর্মকাণ্ড করে থাকে।

ঢাকার আশপাশটাও দূষণের কারণে ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা। রূপগঞ্জের ভুলতার মাছুমাবাদ গ্রামের কথাই ধরুন, সেখানে পার্টেক্সের ফ্যাক্টরী স্থাপিত হয়েছে বিশাল জায়গা জুড়ে। ওখানে লোকাল কিছু লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এলাকায় যে ভয়াবহ টাইপের বায়ুদূষণ ঘটাচ্ছে, সেটা সন্ধ্যার পর সেখানে অবস্থান করলে বোঝা যায়। আমি নিজে সেখানে কোনো একটা কারণে দু’ রাত অবস্থান করেছিলাম সম্প্রতি, তাই ব্যাপারটা আমি চাক্ষুষ দেখে এসেছি।

এতো গেল পার্টেক্সের কথা। কিন্তু পার্টেক্সই কি একমাত্র ফ্যাক্টরি যেটা বায়ুদূষণ বা পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। ঢাকার অভ্যন্তর থেকে শুরু করে আশপাশটায় এরকম হাজার হাজার ফ্যাক্টরি আছে, যেগুলো সংশ্লিষ্ট স্থানের পরিবেশকে চিরতরে ধ্বংস করে ফেলছে। আমাদের দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার যেখানে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে ব্যর্থ, সেখানে এসব অনিয়মকে যে অর্থের বিনিময়ে প্রশ্রয় দিবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। আমাদের – সাধারণ নাগরিকদের বোধ হয় চেয়ে দেখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই মন চায়, দূরে কোথাও গিয়ে বসবাস করি, যেখানে হিংস্র পশু-শ্বাপদ থাকলেও অন্তত পরিবেশ দূষণ নেই।

1 thought on “ঢাকা এবং এর চারপাশে শুধু দূষণ আর দূষণ”

  1. Pingback: কোন দেশে এইডসের কী অবস্থা – INFORMATION N KNOWLEDGE WORTH SHARING

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.