জে.পি. মরগ্যান : মানবতায় প্রশ্নবিদ্ধ একটি নাম

এই ব্যক্তিটি দু’টি কারণে ইতিহাসের পাতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছেন।

১. ওয়ার্ডেন ক্লিফ প্রকল্প থেকে সাপোর্ট তুলে নেয়া

আমরা জানি, নিকোলা টেসলা ছিলেন অমিত প্রতিভাধর একজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। তাঁর স্বপ্ন ছিল সারা বিশ্বের মানুষের জন্য মুক্ত বিদ্যুৎশক্তির ব্যবস্থা করা। তিনি মূলত বায়ুমণ্ডলের আয়নস্ফিয়ারের মধ্যদিয়ে এই বিদ্যুৎশক্তি পাঠাতে চেয়েছিলেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি ওয়ার্ডেন ক্লিফ টাওয়ারটি নির্মাণ করেছিলেন। এই প্রকল্পে অর্থ লগ্নিকারী ছিলেন জে.পি. মরগ্যান। তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়িক। তিনি মূলত চেয়েছিলেন রেডিও সিগন্যাল প্রেরণের ব্যবহারিক কাঠামো তৈরি করতে। কিন্তু টেসলার স্বপ্ন ছিল কিছুটা ভিন্ন। তিনি এমন একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার মাধ্যমে শুধু রেডিও সিগন্যাল নয়, বরং বিদ্যুৎশক্তিও প্রেরণ সম্ভব। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সারাবিশ্বের মানুষের জন্য হয়তো নিখর্চা বিদ্যুৎশক্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। কিন্তু যখনই মরগ্যান বুঝতে পারলেন যে, এ প্রকল্প থেকে তাঁর ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম, তখনই তিনি এ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলেন। টেসলা’র প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান বিশ্বে হয়তো ‘তার’ বলতে কোনো কিছু থাকতো না, সকল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাই হতো তারবিহীন, উপরন্তু অফুরন্ত নিখর্চা বিদ্যুৎশক্তির হাতছানি তো আছেই। কিন্তু জে.পি. মরগ্যানের স্বার্থসন্ধানী মানসিকতার জন্য সেটা আর সম্ভব হলো না।



২. টাইটানিক ট্র্যাজেডি’তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা

জে.পি. মরগ্যানের নাম বিতর্কিত হওয়ার একটি বড় কারণ হলো টাইটানিক জাহাজটি ডোবার পেছনে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। একটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, টাইটানিক দুর্ঘটনায় ডোবে নি, এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডোবানো হয়েছিল। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, টাইটানিক হয়তো কখনোই ডোবে নি, ডুবেছিল একই শিপিং কোম্পানীর আরেকটি জাহাজ, নাম ‘অলেম্পিক’। বস্তুতঃ একটি দুর্ঘটনায় অলেম্পিক জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখনই ঐ জাহাজের মালিক মরগ্যানের মাথায় এই চমৎকার(!) বুদ্ধিটি আসে। তিনি ‘টাইটানিক’ নামে একটি নতুন জাহাজ নির্মাণ শুরু করেন। টাইটানিককে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন এটা কোনো অবস্থাতেই কখনোই না ডোবে। অথচই এই জাহাজটিই এর প্রথম যাত্রাতেই ডুবে যাবে – এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। কারণ বরফখণ্ডের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবেছে – এমন জাহাজ পৃথিবীর ইতিহাসে একটিই, আর সেটি হলো কথিত ‘টাইটানিক’। ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীরা (কন্সপিরেসি থিওরিস্ট) বিশ্বাস করেন যে, টাইটানিকের নামে আসলে মেরামত করা অলেম্পিক জাহাজটিই পানিতে ভাসানো হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে মধ্য আটলান্টিকে ডুবানো হয়েছিল। এ ব্যাপারে হয়তো জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং ক্রুগণ জড়িত ছিলেন। যাই হোক, জাহাজডুবির এ ঘটনায় মরগ্যান বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ পান, যার দ্বারা তিনি তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচান। এ ঘটনায় নিরীহ মানুষ হতাহত না হলে হয়তো কারোরই কিছু বলার থাকতো না, কারণ আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্য এরকম কারচুপির উদাহরণ ইতিহাসে ভুরিভুরি। তবে টাইটানিক ট্র্যাজেডি’র বেলায় ব্যাপারটা আলাদা। ভুলে গেলে চলবে না যে, টাইটানিক ডুবিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। এতগুলো মানুষকে জেনেশুনে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া যে কত বড় অপরাধ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধারণা করা হয়ে থাকে, ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত একটি উপন্যাস পড়ে মরগ্যানের মাথায় টাইটানিক ডোবানোর বুদ্ধিটা আসে। ঐ উপন্যাসের নাম ‘রেক অফ দ্য টাইটান’। উপন্যাসের কাহিনী টাইটানিকের সাথে পুরোপুরি মিলে। অর্থাৎ জাহাজের নাম ‘টাইটান’, এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে কখনোই কোনো পরিস্থিতিতেই না ডোবে, অথচ সেটি তার প্রথম যাত্রাতেই সমুদ্রে অবস্থিত বিশাল এক বরফখণ্ডের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় এবং এতে বিপুল প্রাণহানী ঘটে।



সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার

এই ভদ্রলোক হচ্ছেন নিকোলা টেসলা। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি ওনাকে সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, উনি যদি সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে থাকেন, তাহলে বর্তমান সময়ে উনি এত অখ্যাত কেন? সায়েন্স বা বিজ্ঞান নিয়ে যারা সারাজীবন নাড়াচাড়া করেছেন, এমন অনেক ব্যক্তিও নিকোলা টেসলার নাম হয়তো কোনোদিন শুনেন নি, আর শুনলেও উনি যে আসলে কী কী কর্মকাণ্ড ও আবিষ্কার করেছেন, সে বিষয়ে পুরোপুরি অজ্ঞ। অনেকের ধারণা উনি তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বিষয়ে কিছু কাজকর্ম করেছেন – কিন্তু সেগুলো আসলে যে কী, সেটা সঠিকভাবে বলতে পারবে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। এমনকি যাঁরা তড়িৎ প্রকৌশল বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা বা গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী অর্জন করেছেন, তাঁরাও টেসলাকে একজন ছোটোখাট বিজ্ঞানী হিসেবেই চিনেন; তিনি যে আসলে আইনস্টাইনের সমপর্যায়ের একজন বিজ্ঞানী তথা সর্বকালের সেরা তড়িৎ প্রকৌশলী সেটা হয়তো বিলকুল জানতেন না বা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেন নি।



জেনে রাখুন, ওনার অখ্যাত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো, উনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়নের এমন এক অঞ্চলে যা বর্তমানে ক্রোয়েশিয়া নামে পরিচিত। প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষে তিনি আমেরিকাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁর জীবনের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন। বিদ্যুৎ আবিস্কৃত হওয়ার পর সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কারগুলো, যেমন – এসি জেনারেটর,  এসি মোটর, ট্রান্সফর্মার, ট্রান্সমিশন লাইন, রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ – এ সবকিছুই তাঁর হাত ধরে এসেছে (টেসলার রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ-ব্যবস্থার পেটেন্টের অবৈধ ব্যবহার করেন মার্কনি; এ বিষয়ে আমেরিকান আদালত প্রথমে মার্কনির পক্ষে রায় দিলেও পরবর্তীতে টেসলাই রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ-ব্যবস্থা আবিষ্কারের যোগ্য দাবীদার বলে চূড়ান্তভাবে মেনে নেয়)। এমনকি বর্তমান যুগে ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনেশিয়েটিভ’ নামে যে ব্যবস্থা প্রতিপক্ষ দেশের মিসাইল থেকে শুরু করে এটম বোমা পর্যন্ত আটকে দিতে পারে, সে ব্যবস্থা বা সিস্টেমের প্রথম রূপকার হলেন টেসলা (কথিত আছে যে, টেসলার মৃত্যুর পর আমেরিকান সরকার অবৈধভাবে তাঁর কাগজপত্রগুলো ব্যবহার করে উক্ত সিস্টেম ডেভেলপ করা শুরু করে, আর পরবর্তীতে রাশিয়া থেকে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ভাইপো এসে তাঁর সেই কাগজপত্রগুলো নিয়ে গিয়ে রাশিয়ান সরকারের হাতে তুলে দেন, এভাবে রাশিয়াও উক্ত সিস্টেম ডেভেলপ করতে সমর্থ হয়)।

কর্মজীবনে এত অর্জন ও সাফল্য থাকা সত্ত্বেও উনি মৃত্যুর পর খুব একটা প্রচার পান নি। এর প্রধান কারণ হলো, উনি জন্মগতভাবে যেহেতু রাশিয়ার নাগরিক, তাই পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষ করে আমেরিকান মিডিয়া ওনার নাম প্রচার করতে চায় নি। এছাড়া আরো একটা কারণ রয়েছে, সেটা খুলে বলা যাক। ওনার একবার নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ১৯১০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে; কিন্তু পুরষ্কারটা শেয়ার করতে হবে তথাকথিত অামেরিকান দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের সাথে। এই ব্যক্তির সাথে টেসলার তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল। দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয়েছিল টেসলা যখন এডিসনের কোম্পানিতে কাজ করতেন তখন থেকে। এডিসন টেসলাকে তাঁর ডিসি মোটরের পারফরমেন্স বাড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। টেসলা তাঁর দায়িত্ব সম্পন্নের পর যখন পারিশ্রমিক চাইলেন, তখন এডিসন তাঁর সাথে উপহাস করলেন এবং প্রতিশ্রুত অর্থের চেয়ে অনেক কম পারিশ্রমিক দিতে চাইলেন। এ অপমান টেসলা সহজভাবে নেন নি। তিনি অভিমান করে চাকুরি ছেড়ে দেন, ফলশ্রুতিতে পরবর্তী এক বছর তাঁকে মাটি কাটার কাজ করতে হয়। এমনকি টেসলা যখন সকল বাধাবিপত্তি পেরিয়ে সফল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, তখনো তাঁর সাথে নতুন করে এডিসনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এবারের দ্বন্দ্বের কারণ এসি কারেন্ট আর ডিসি কারেন্ট নিয়ে মতবিরোধ। টেসলা ছিলেন এসি কারেন্টের সমর্থক, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ডিসি কারেন্ট দিয়ে যে কাজগুলো সম্ভব নয়, সেগুলো এসি কারেন্ট দিয়ে সম্ভব, যেমন দূরদূরান্তে বিদ্যুৎ প্রেরণ করা। সুতরাং এই আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে নোবেল পুরষ্কার শেয়ার করা টেসলার পক্ষে সম্ভব নয় – এটা তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। এডিসনও অনুরূপ ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এডিসন যেহেতু জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিক, আর টেসলা ছিলেন প্রবাসী থেকে নাগরিক, তাই আমেরিকান তথা পশ্চিমা মিডিয়ার সাপোর্ট ছিল এডিসনের পক্ষেই।

এই রচনার প্রথম অনুচ্ছেদে টেসলাকে আইনস্টাইনের সমপর্যায়ের বিজ্ঞানী বলা হয়েছে, এটি অতিরঞ্জিত কিছু নয়; কারণ দু’জনেই প্রায় সমান মেধাবী ছিলেন। এর মধ্যে টেসলা ছিলেন ব্যবহারিক বিজ্ঞানী অর্থাৎ তিনি বস্তুজগত নিয়ে কাজ করতেন আর আইনস্টাইন ছিলেন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী। আইনস্টাইন যদিও টেসলাকে অনেক পছন্দ করতেন এবং সর্বদাই তাঁর প্রশংসা করতেন, তবে টেসলা আইনস্টাইনকে ভালো চোখে দেখতেন কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একবার তো তিনি আইনস্টাইনকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘আজকালকার তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা গভীর চিন্তা করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা পরিষ্কার (সঠিক) চিন্তা করতে পারেন কিনা, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’ টেসলার এই বক্তব্য নিতান্ত অমূলক নয়। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আবিষ্কারের বহুকাল পরে আইনস্টাইন নিজের হিসাবনিকাশগুলোর দিকে আরেকবার ভালো করে চোখ বুলান, তাতে তিনি একটি বৃহৎ ভুল দেখতে পান। এবার বুঝলেন তো, যেকোনো তত্ত্ব বা থিওরি যতই বিখ্যাত হোক না কেন, সেখানেও একটা ‘গোড়ায় গলদ’ থাকতে পারে।




যাই হোক, এবার টেসলার জীবনযাপন নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৬ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪৩ সালে। জীবদ্দশায় তিনি অনেক অর্থ উপার্জন করেছিলেন, কিন্তু তিনি প্রায় সব অর্থই বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেন এবং ব্যাংকে তেমন কোনো টাকাপয়সা রাখেন নি। যার ফলে শেষ বয়সে তাঁকে অনেক খারাপ সময় পার করতে হয়েছে, এমনকি যৌবনে যে কোম্পানিগুলোর জন্য তিনি কাজ করেছেন, সেগুলো থেকে তাঁকে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছিল। ঐ সকল কোম্পানিগুলোর উত্থানের পেছনে তাঁর যে বিশাল অবদান ছিল, সে কথা মাথায় রেখেই তারা তাঁকে এই আর্থিক সাহায্যটুকু করতো।

নিকোলা টেসলা ৮৭ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন; আরো কিছুদিন হয়তো বাঁচতেন, কিন্তু উনার বয়স যখন ৮৩ বছর, তখন নিউইয়র্কের রাস্তায় একটা ট্যাক্সি তাঁকে আঘাত করে। এর কয়েক বছর পরেই রোগেশোকে ভুগে উনি মারা যান। পরিশেষে বলতে পারি, উনি হয়তো ক্রিশ্চিয়ান ছিলেন, তারপরও মানবতার কল্যাণে উনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিশাল অবদান রেখেছেন, সে কথা স্মরণ করে হলেও আমরা সকলে উনার রূহের মাগফিরাত (Redemption) ও শান্তি কামনা করতে পারি।

জেনে নিন ফেরাউন কে ছিলেন

ফেরাউনকে ইসলামের সকল অনুসারী (এবং সম্ভবত ইহুদীরাও) খারাপ চোখে দেখে। মজার ব্যাপার হলো, ‘ফেরাউন’ শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়, বরং এটি একটি বংশের নাম। দীর্ঘ একটা সময় (প্রায় কয়েকশত বছর) ধরে মিশরের সম্রাটকে ‘ফেরাউন’ বা ‘ফারাও’ বলা হতো। বংশ পরম্পরায় ক্ষমতায় আসা এই সম্রাটেরা নিজেদেরকে ‘ঈশ্বর’ বলে দাবী করতেন, ফলে মিশরের তৎকালীন অধিবাসীরাও ফারাওকে ঈশ্বর বলে মেনে নিতে বাধ্য হতেন। তবে ফেরাউন নামে যে ব্যক্তিটিকে মুসলমানেরা জানে তাঁর প্রকৃত নাম হলো ‘রেমেসিস’। শত্রু হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন মুসা (আঃ)-এর পালক ভাই। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, মুসা (আঃ) ছিলেন রেমেসিসের পালক ভাই, কারণ রেমেসিসের মা (সম্রাটের স্ত্রী) মুসা (আঃ)-কে নীল নদের কিনারে কুঁড়িয়ে পেয়ে তাঁকে লালনপালন করে বড় করেন।



তাঁরা দু’জন প্রায় সমবয়সী ছিলেন এবং একসাথেই বেড়ে উঠেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে, মুসা নবী ছোটকাল থেকেই প্রচণ্ড দুর্দান্ত ও দুষ্ট ছিলেন। তিনি প্রায়ই দুষ্টামি ও অঘটন ঘটিয়ে ভাই রেমেসিসের উপর এর দায়ভার চাপিয়ে দিতেন। এজন্য রেমেসিস ছোটকাল থেকেই ভিতরে ভিতরে মুসা নবীর প্রতি ক্ষেপে ছিলেন। তাঁরা দু’জন প্রায় সমবয়সী হলেও রেমেসিস মুসা নবীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় ছিলেন, তাই রেমেসিসই ছিলেন সাম্রাজ্যের পরবর্তী দাবীদার। রেমেসিসের পিতা তথা তৎকালীন সম্রাট প্রায় সবসময়ই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তাঁর বড় পুত্রের উপর ক্ষেপে থাকতেন, কারণ তাঁদের দু’ভাইয়ের দুষ্টুমির বেশিরভাগ অভিযোগই রেমেসিসের নামে আসতো। সম্রাটের আশংকা ছিল এই যে, রেমেসিসের কারণেই হয়তো শতশত বছর ধরে চলে আসা তাঁদের পারিবারিক সংস্কৃতি ও রাজত্ব হুমকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইতেন, রেমেসিসের কারণেই ফেরাউন বা ফারাওদের রাজত্বের অবসান ঘটতে পারে। সম্রাট তাঁর নিজের পুত্রকে সর্বদাই আরো কঠোর ও সতর্ক হওয়ার জন্য বলতেন, কিন্তু তারপরও রেমেসিস প্রায়ই বিতর্কের মুখে পড়তেন।

এ ব্যাপারগুলো নিয়ে তিনি সর্বদাই বিব্রত থাকতেন, একারণে তিনি তাঁর পালক ভাই মুসা (আঃ)-কে কখনোই ভালো চোখে দেখতেন না। পরবর্তীতে মুসা নবী যখন নবুওয়্যত প্রাপ্ত হলেন, তখন রেমেসিসই ছিলেন মিশরের সম্রাট, কারণ তাঁদের পিতা ইতিমধ্যেই বিগত হয়েছেন। এসময় মুসা নবী যখন রেমেসিসকে আল্লাহ’র (একমাত্র স্রষ্টা) দাওয়াত দিলেন এবং বনী ইসরাইল বংশের লোকদেরকে ছেড়ে দিতে বললেন, তখন রেমেসিস তা অস্বীকার করলেন। আল্লাহ’র অস্তিত্বকে অস্বীকার করলেও তিনি তাঁর পালক ভাই মুসা’র অনুরোধে ঐ লোকগুলোকে ছেড়ে দিতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিগত পিতার কথাগুলো সবসময়ই তাঁর কানে বাজতো ‘তুমি হলে বংশের কুলাঙ্গার, তোমার কারণেই শতশত বছর ধরে চলে আসা আমাদের বংশীয় রাজত্ব ও ঐতিহ্যের পতন ঘটবে।’ এ কথাগুলো স্মরণ করেই রেমেসিস কঠোর অবস্থানে গেলেন এবং বনী ইসরাইল বংশের দাসদেরকে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলেন।

পরবর্তী ঘটনাসমূহ সবারই জানা। মিশরের উপর আল্লাহ’র গজব নেমে আসলো এবং ‘সোনা’র মিশর প্রায় শ্মশানভূমি হয়ে গেলো। রেমেসিস এরপরও চুপচাপ ছিলেন এবং এ ‘গজব’গুলো সহ্য করার চেষ্টা করলেন, অর্থাৎ মুসা নবীকে আটকের বা জানে মেরে ফেলার কোনো পদক্ষেপ তিনি নেন নি। কিন্তু আল্লাহ’র গজবের দরুণ যখন তাঁর স্বীয় নাবালক পুত্র মারা গেল, তখন তাঁর মাথা আউলা হয়ে গেল। তখন তিনি প্রথমতঃ বনী ইসরাইল বংশের লোকদেরকে ছেড়ে দিলেও পরবর্তীতে সৈন্যবাহিনী সাথে নিয়ে মুসা নবীসহ তাদের সবাইকে নীল নদের মধ্যে মেরে ফেলার চেষ্টা করলেন। এতে হলো কী, মুসা নবীসহ বনী ইসরাইলের লোকজন নদী পার হতে পারলেও ফেরাউন রেমেসিস তাঁর সৈন্যদলসহ সেখানে ডুবে মরলেন।