যীশুখ্রিস্ট ও হারকিউলিসের মধ্যকার মিলসমূহ

যীশুখ্রিস্ট কে সেটা নতুন করে বলার দরকার নেই। যীশুখিস্টকে মুসলমানেরা হযরত ঈসা (আঃ) নামে চিনে। তবে যীশুখ্রিস্ট বা ঈসা (আঃ)-এর জীবনী নিয়ে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কিছু মতবিরোধ আছে। এখানে আমরা খ্রিস্টানদের মতামত অনুসারে আলোকপাত করবো। অন্যদিকে, গ্রীক মিথোলজি অনুসারে হারকিউলিস হলেন দেবরাজ জিউসের এক পুত্র, যার জন্ম হয়েছিল কোনো এক মানবীর গর্ভে। তাহলে জেনে রাখুন, যীশুখ্রিস্ট ও হারকিউলিসের মধ্যকার মিলসমূহঃ

(১) দু’জনই বলতে গেলে ঈশ্বরের পুত্র। খ্রিস্ট ধর্মমতে, কুমারী মাতা মেরীর গর্ভে স্বয়ং ঈশ্বরের পুত্র যীশুর জন্ম হয়। আর গ্রীক পুরাকথা অনুসারে, দেবরাজ জিউস ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতা বা দেবতাদের রাজা; সুতরাং ঈশ্বর হিসেবে একজনকে বেছে নিতে বলা হলে, সর্বপ্রথমেই আসবে দেবরাজ জিউসের নাম, সেই অর্থে হারকিউলিসও ঈশ্বরের পুত্র ছিলেন।

(২) দু’জনেই আর্ত-মানবতার কল্যাণে আজীবন নিয়োজিত ছিলেন।

(৩) দু’জনের জীবনই অনেক সংগ্রামের ছিল; দুঃখ-কষ্ট, অভাব-বঞ্চনার মধ্য দিয়ে কেটেছে।

(৪) দুজনেই তাদের জীবদ্দশায় ‘জারজ’ তকমা ধারণ করেন। কুমারী মাতা মেরীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করায় যীশুখ্রিস্ট শৈশব থেকেই ‘জারজ’ উপাধি লাভ করেন। আর, হারকিউলিস আসলেই দেবতা জিউসের অবৈধ সন্তান ছিলেন।

(৫) দু’জনেরই যুবক বয়সে মর্ত্য-জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এর মধ্যে হারকিউলিস স্বেচ্ছায় আত্মাহুতি দেন, আর এক কুচক্রীর ষড়যন্ত্রে  যীশুর জীবনাবসান ঘটে।




(৬) দু’জনেই আগে থেকে সম্ভাব্য মৃত্যুর ব্যাপারে জানতেন। হারকিউলিস যখন ১২টি অসাধ্য কাজ সাধন করেও মনের শান্তি পেলেন না পুরনো একটি দুর্ঘটনার স্মৃতি মনে করে (সৎ মাতা হেরার কালো-জাদুর কারণে এক রাতে তার মাথা বিগড়ে যায় এবং নিজের স্ত্রী-সন্তানদেরকে শত্রু বিবেচনা করে হত্যা করেন), তখন তিনি আত্মাহুতির মাধ্যমে নিজের সব জ্বালা-কষ্ট অবসানের সিদ্ধান্ত নিলেন। আর যীশুখ্রিষ্ট জানতেন যে, তাঁর ১২ সাহাবীর মধ্যে এক বিশ্বাসঘাতক তাঁকে রোমানদের হাতে ধরিয়ে দেবে।

(৭) দু’জনেই স্ব-স্ব পিতার কাছে অমর হিসেবে প্রত্যাবর্তণ করেন। দেবরাজ জিউস যখন দেখতে পেলেন যে, তাঁর পুত্র হারকিউলিস একজন সত্যিকারের বীর এবং সে তার মর্ত্যের জীবনে বহু ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছে, তখন পুত্রের প্রতি তাঁর দয়া হয়। তাই চিতার আগুনে জ্বলে হারকিউলিস যখন আত্মাহুতি দিলেন, তখন অনতিবিলম্বে জিউস তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং অমরত্ব প্রদান করে স্বর্গে নিজের কাছে আশ্রয় দেন। আর যীশুখ্রিস্ট কীভাবে অমর হলেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মৃত্যুর দুই দিন পর ইস্টার সানডেতে তাঁর পুনরুত্থান ঘটে (ঈশ্বরই এই পুনরুত্থান ঘটান)। তখন যীশু মানব সম্প্রদায়ের কাছে সাময়িকের জন্য আবারো ফিরে আসেন এবং আরো কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়ে যান।

আসুন, আমরা এই দুই মহাপুরুষের জন্য অন্তর থেকে প্রার্থনা করি।



জারজ সন্তানকে হত্যা করবেন না, মনে রাখবেন হারকিউলিসও জারজ ছিলেন

দু’-তিন আগে তো ভ্যালেনটাইন্স ডে গেলো। যারা দিবসটা উদযাপন করেছেন, তারা বেশিরভাগই দিবসটির তাৎপর্য না বুঝে শুধুুমাত্র বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে ফুর্তি করেই দিনটা কাটিয়েছেন। এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। ফলে অচিরেই অনেক নারীর পেটে অবৈধ সন্তান জন্ম নেবে। যদি খুব শীঘ্রই এই প্রেগন্যান্সি সনাক্ত করতে পারেন, তাহলে ক্ষুদ্রাকার ভ্রুণটিকে নষ্ট করতে পারেন, এতে আমি সমস্যা দেখি না। তবে ভ্রুণটা যদি যথেষ্ট বড় হয়ে গিয়ে থাকে, যেমনঃ তিন-চার মাসের, তাহলে দয়া করে এই বাচ্চাটিকে হত্যা করবেন না, তাকে পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে দিন। তারও অধিকার রয়েছে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার। এই কথাগুলো বলতে বাধ্য হলাম এই কারণে যে, কিছুদিন পরপরই ফেসবুকে অবৈধ ভ্রুণ বা শিশুবাচ্চার লাশের ছবি চোখে পড়ে, তখন কষ্টে বুকটা ফেঁটে যায় আমার।

সামর্থ্য থাকলে পৃথিবীর সকল অসহায় বাচ্চার ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতাম আমি। যেহেতু সে সামর্থ্য নেই, তাই শুধুমাত্র এই অনুরোধটুকু করছি, ওদেরকে কেউ হত্যা করবেন না। আপনি না পারলেও পৃথিবীতে কেউ না কেউ ঠিকই আছেন ওদের ভরণপোষণ করার মতোন। অনেক নিঃসন্তান স্বামী-স্ত্রী আছেন যারা বাচ্চা পালক নিতে ইচ্ছুক, বাচ্চা বৈধ না অবৈধ অত হিসাব তারা করবেন না; কারণ যাদের নেই, তারাই বোঝে বাচ্চার সত্যিকার মর্ম। সাময়িক ফুর্তি করতে গিয়ে আপনার পেটে বাচ্চা এসেছে, এই পাপাচার সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করলেও করতে পারেন; তবে বাচ্চা খুন করার পাপ সৃষ্টিকর্তা কোনোদিনই ক্ষমা করবেন না বলে আমার বিশ্বাস।




সুতরাং পেটে তিন-চার মাসের বাচ্চা থাকলে সেটাকে হত্যা না করে বরং কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বাচ্চাটিকে শেষ পর্যন্ত জন্ম দিন, যেমনঃ পেট বেশ বড় হয়ে গেলে কোনো অাত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিন। বাচ্চাটিকে জন্মের পরপরই কোনো আগ্রহী নিঃসন্তান দম্পত্তির হাতে তুলে দিন। মায়ের বুকের দুধ না পেলেও বাঁচবে সে, ল্যাকটোজেন খাইয়ে তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। বাচ্চাটিকে বাঁচিয়ে রেখে হয়তো আপনার তাৎক্ষণিক কোনো লাভ নেই; তবে সৃষ্টিকর্তার দোহাই, বাচ্চাটির আত্মা নিজের অজান্তেই আপনার জন্য অনেক দোয়া করবে।  আপনিও এটা ভেবে শান্তি পাবেন যে, মানবহত্যার মতো কোনো মহাপাপ আপনি করেন নি। এই বাচ্চাটিকে বাঁচাতে গিয়ে আপনাকে যদি ভোগান্তি সহ্য করতে হয়, কিছুটা অপমান ও গঞ্ছনা সহ্য করতে হয়, তবুও সেটা করুন না; এটাতো আপনারই রক্ত। কেমন স্বার্থপর মা আপনি, একটা বাচ্চাকে মেরে ফেলে পরের বাচ্চাগুলোকে মানুষ করার স্বপ্ন দেখছেন?

মনে রাখবেন, সৃষ্টিকর্তার চোখে বৈধ বা অবৈধ বাচ্চা/মানুষ বলে কিছু নেই। জারজ হলেই যে সে সমাজে ঘৃণিত হবে, ব্যাপারটা তা নয়। গ্রীক দেবরাজ জিউসের পুত্র হারকিউলিস ছিলেন তাঁর অবৈধ সন্তান, তা সত্ত্বেও হারকিউলিস হলেন মিথোলজি (Mythology) বা পুরাকথার সর্বশ্রেষ্ঠ অ্যাকশন হিরো। তিনি নিজের বীরত্ব ও ধৈর্য্যের চরম পরীক্ষা দেন, তাই শেষ পর্যন্ত পিতা জিউস তাঁকে অমরত্ব প্রদান করে মানব থেকে দেবতা বানিয়ে নিজের কাছে স্বর্গে চিরস্থায়ী করে নেন।

বর্তমানে তথা শতশত বছর ধরে যে মানুষটিকে পৃথিবীর বেশিরভাগ লোক শ্রদ্ধা করেন এবং ঈশ্বরপ্রেরিত বলে মনে করেন, সেই যীশুখৃষ্ট যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন একদল দুষ্ট লোক তাকে ‘জারজ’ তকমা দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমরা সবাই জানি, তিনি ছিলেন ঈশ্বরপ্রেরিত অলৌকিক শিশু। এই শিশুটিই বড় হয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করেন। আজকে ওনার নামই পৃথিবীর বেশিরভাগ মানুষ প্রতিনিয়ত নেয়।



‘ভিলেন’ যখন সন্তানবৎসল পিতা

পাবলো এসকোবারের নাম শুনেছেন? তিনি হলেন কলম্বিয়ার প্রাক্তন মাদক সম্রাট। তিনি তার যোগাযোগের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকাকে মাদকের স্বর্গরাজ্য বানিয়ে নিয়েছিলেন এবং এভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা নিজের পকেটস্থ করেছিলেন। যে-ই তার পথের কাঁটা হয়েছিল, তাকেই তিনি শেষ করেছেন। কয়েকশত পুলিশ ও বিচারকের মৃত্যুর জন্য দায়ী তিনি। এমনকি কলম্বিয়ার তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীও তাঁর বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলতে সাহস পেত না। অর্থ আর অস্ত্রের জোরে দীর্ঘদিন ধরে কলম্বিয়ার প্রতিটি সেক্টরই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন। সত্যি বলতে কি, ডন হবার পর যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন তিনিই ছিলেন কলম্বিয়ার অঘোষিত শাসনকর্তা। কিন্তু তাঁর শেষটা ভালো হয় নি, ১৯৯৩ সালে সিআইএ-‘র হাতে তাঁকে মরতে হয়েছিল। জীবদ্দশায় তাঁর জন্য দুঃখের ব্যাপার হলো, তিনি যত অর্থ কামিয়েছিলেন তার বেশিরভাগই বিভিন্নভাবে নষ্ট হয়েছিল। তিনি বালিশের মধ্যে, তোষকের নিচে এমনকি মাটির নিচেও অর্থ পুঁতে রাখতেন।

তবে মানুষ হিসেবে তিনি যেমনই হোন না কেন, নিজের সন্তানদেরকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। এবার তাঁর সন্তানবৎসলতার একটি কাহিনী শোনা যাক। একবার তিনি তাঁর এক নাবালক মেয়েকে নিয়ে জঙ্গলে আশ্রয়ে নিয়েছিলেন, পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে। সে রাতে প্রচণ্ড শীত পড়েছিল, তাঁর কাছে তেমন কোনো শীতবস্ত্র বা কম্বল ছিল না। তাই নিজের মেয়েকে শীতের হাত হতে বাচাঁতে সেই রাতে তিনি তাঁর সাথে থাকা কয়েক মিলিয়ন ডলার আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। টাকাগুলো পুড়ে যে উত্তাপ তৈরি করেছিল, তার দ্বারাই বাপ আর মেয়ে মিলে শীত নিবারণ করেছিলেন। সমাজে ভিলেন হিসেবে পরিচিত হলেও ঐদিন তিনি নিজেকে সন্তানবৎসল পিতা হিসেবে চরম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন।



এবার রামায়ণের কথাই ধরুন। রামায়ণ অনুসারে রাবণের আগে তাঁর দুই পুত্র নিহত হয়েছিলেন। এ নিয়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ রচনা করেন। এই কাব্যে রাবণকে ভিলেন হিসেবে নয়, বরং একজন সন্তানবৎসল পিতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাঁর পুত্র মেঘনাদ যখন মারা যান, তখন রাবণ তাঁর বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেঘনাদের মৃতদেহ সনাক্ত করার জন্য এদিক-ওদিক তাকাতে থাকেন। এসময় তাঁর বুকটা খা-খা করতে থাকেন। তিনি তাঁর মৃত সন্তানের জন্য অসীম মমতা আর শোক অনুভব করেন। পুত্রের মৃত্যুতে তাঁর পাষাণ হৃদয় কিছুটা হলেও গলে যায়, শোকে মুহ্যমান হন তিনি। তিনি তাঁর পুত্রহত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য দৃঢ়ভাবে সংকল্পবদ্ধ হন।

পৃথিবীর প্রতিটি পিতাই সন্তানবৎসল। নিজে মানুষ হিসেবে ভালো বা খারাপ যেমনই হোন না কেন, সন্তানকে নিজের জীবনের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। 

বিজ্ঞানীদের সাংসারিক জীবন যেমনটা হয়

বিজ্ঞানীদের সাংসারিক জীবন সম্ভবত খুব একটা সুখের হয় না। এ কথা ঢালাওভাবে সকল বিজ্ঞানীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও বেশিরভাগ বিজ্ঞানীর জন্যই প্রযোজ্য। এখানে আমরা গুটিকয়েক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবনগাথা পর্যবেক্ষণ করি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের কথাই ধরা যাক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাশ করার পর তাঁর ডিপার্টমেন্টাল সহপাঠী এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাথে ওনার দাম্পত্যজীবন খুব একটা সুখের হয় নি। আসলে ওনাদের দু’জনার মনমানসিকতায় বিশাল ফারাক ছিল। আইনস্টাইন ছিলেন পুরোপুরি বিজ্ঞানী মানসিকতার আর আত্মভোলা প্রকৃতির, আর ওনার স্ত্রী ছিলেন পুরোপুরি সাংসারিক মানসিকতার। এ ধরনের মানসিকতা আইনস্টাইনের কাছে স্বার্থপর আর নিচু মনে হতো। তাই কয়েকটি বাচ্চাকাচ্চা হওয়ার পরও আইনস্টাইন তাঁর প্রথম স্ত্রীর সাথে বনিবনা করতে পারেন নি। চূড়ান্ত ডিভোর্সের আগে ওনাদের সম্পর্কটা জোড়াতালি দিয়ে কোনোমতে টিকে ছিল। এসময় আইনস্টাইন তাঁর স্ত্রীকে অদ্ভুত সব শর্ত দিয়েছিলেন, যেমনঃ আইনস্টাইন যখন চিন্তামগ্ন থাকবেন বা কাজে ব্যস্ত থাকবেন, তখন স্ত্রী তাঁকে বিরক্ত করতে পারবেন না ইত্যাদি।

একসময় ওনাদের যখন ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল, তখন আইনস্টাইন কথা দিয়েছিলেন যে, নোবেল পুরষ্কারের সমস্ত অর্থই তিনি তাঁর প্রথম স্ত্রীর সন্তানদেরকে দিবেন। এ অর্থের জন্য তাঁদেরকে বহুবছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, কারণ আইনস্টাইন তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত তত্ত্ব আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বের জন্য কখনোই নোবেল পান নি। দীর্ঘসময় অপেক্ষার পর আলোক-তড়িৎ ক্রিয়ার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের জন্য তিনি নোবেল পুরষ্কার পান। আইনস্টাইন কিছুকাল একা থাকলেও একসময় তিনি তাঁর এক ফার্স্ট কাজিন (যেমন, মামাতো, চাচাতো, খালাতো, ফুফাতো বোন) – এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে যান এবং পরবর্তীতে তাঁকে বিয়ে করেন। ঐ সংসার সুখের হয়েছিল বলে শোনা যায়।



বিজ্ঞানী নিউটনের কথাই ধরুন, তিনি তো আজীবন বিয়েই করেন নি। এর কারণ হলো, বেশিরভাগ বিজ্ঞানীদের মতো তিনিও আত্মভোলা ছিলেন, যার ফলে তিনি তাঁর প্রেমের কথা প্রিয় বান্ধবীকে কখনোই বলতে পারেন নি। প্রতিদিনই তিনি ভাবতেন,আজই কথাটা বলতে হবে। কিন্তু যেইনা ঐ ভদ্রমহিলা তাঁকে তাঁর গবেষণার অগ্রগতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেন, তখন তিনি বিস্তারিত লেকচার দিতে শুরু করতেন, আর এভাবেই সময় বয়ে যেত। শেষে নিউটন ভাবতেন, পরের দিন বলবেন; আর ঐ মহিলা ভাবতেন, বেচারা আজও তাঁকে মনের কথাটা বললো না। এভাবে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হবার পর ঐ মহিলা ভাবলেন, নিউটন হয়তো তাঁকে ভালোবাসেন না, তাই তখন তিনি হাল ছেড়ে দিয়ে অন্য এক পুরুষকে বিয়ে করে নেন। আর বেচারা নিউটন সেই দুঃখে সারাজীবন চিরকুমার থেকে যান। তাঁর সুখদুখের সাথী ছিল একটি পোষা কুকুর, যা একবার তাঁর আবিষ্কারের নথিপত্রের বেশিরভাগই নষ্ট করে ফেলেছিল।

এবার বিখ্যাত বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার কথায় আসা যাক। তিনি নারীদের চেয়ে বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড বেশি পছন্দ করতেন। এক স্বীকৃত বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবার পর নিউইয়র্কের অনেক বিবাহিতা-অবিবাহিতা নারী তাঁর পিছনে ঘুরঘুর শুরু করে। এদের কাছ থেকে রেহাই পাবার জন্য তথা বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে অধিকতর মনোনিবেশ করার জন্য তিনি ৪০ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় তাঁর পুরুষত্ব নষ্ট করে ফেলেন (হয়তো কোনো অপারেশনের সহায়তা নিয়েছিলেন)। নিজের এ কর্মের জন্য তিনি পরবর্তীতে বহু অনুশোচনা করেছিলেন, কারণ এর কারণে তিনি জীবনে আর বিয়ে করতে পারেন নি। তিনি যেহেতু ৮৭ বছর বেঁচে ছিলেন, সুতরাং জীবনের বেশিরভাগ সময় তাঁকে একা একা অতিবাহিত করতে হয়েছিল। কারণ বাবা-মা, আত্মীয়-স্বজনকে তিনি স্বদেশে (ক্রোয়েশিয়া) রেখে আমেরিকার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত তিনি আমেরিকার নিউইয়র্কে ছিলেন।



জে.পি. মরগ্যান : মানবতায় প্রশ্নবিদ্ধ একটি নাম

এই ব্যক্তিটি দু’টি কারণে ইতিহাসের পাতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছেন।

১. ওয়ার্ডেন ক্লিফ প্রকল্প থেকে সাপোর্ট তুলে নেয়া

আমরা জানি, নিকোলা টেসলা ছিলেন অমিত প্রতিভাধর একজন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী। তাঁর স্বপ্ন ছিল সারা বিশ্বের মানুষের জন্য মুক্ত বিদ্যুৎশক্তির ব্যবস্থা করা। তিনি মূলত বায়ুমণ্ডলের আয়নস্ফিয়ারের মধ্যদিয়ে এই বিদ্যুৎশক্তি পাঠাতে চেয়েছিলেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি ওয়ার্ডেন ক্লিফ টাওয়ারটি নির্মাণ করেছিলেন। এই প্রকল্পে অর্থ লগ্নিকারী ছিলেন জে.পি. মরগ্যান। তাঁর লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়িক। তিনি মূলত চেয়েছিলেন রেডিও সিগন্যাল প্রেরণের ব্যবহারিক কাঠামো তৈরি করতে। কিন্তু টেসলার স্বপ্ন ছিল কিছুটা ভিন্ন। তিনি এমন একটি ব্যবস্থা বা সিস্টেম তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার মাধ্যমে শুধু রেডিও সিগন্যাল নয়, বরং বিদ্যুৎশক্তিও প্রেরণ সম্ভব। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সারাবিশ্বের মানুষের জন্য হয়তো নিখর্চা বিদ্যুৎশক্তির ব্যবস্থা করা সম্ভব হতো। কিন্তু যখনই মরগ্যান বুঝতে পারলেন যে, এ প্রকল্প থেকে তাঁর ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা কম, তখনই তিনি এ প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলেন। টেসলা’র প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বর্তমান বিশ্বে হয়তো ‘তার’ বলতে কোনো কিছু থাকতো না, সকল বৈদ্যুতিক ব্যবস্থাই হতো তারবিহীন, উপরন্তু অফুরন্ত নিখর্চা বিদ্যুৎশক্তির হাতছানি তো আছেই। কিন্তু জে.পি. মরগ্যানের স্বার্থসন্ধানী মানসিকতার জন্য সেটা আর সম্ভব হলো না।



২. টাইটানিক ট্র্যাজেডি’তে তাঁর সংশ্লিষ্টতা

জে.পি. মরগ্যানের নাম বিতর্কিত হওয়ার একটি বড় কারণ হলো টাইটানিক জাহাজটি ডোবার পেছনে তাঁর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। একটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্বমতে, টাইটানিক দুর্ঘটনায় ডোবে নি, এটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে ডোবানো হয়েছিল। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, টাইটানিক হয়তো কখনোই ডোবে নি, ডুবেছিল একই শিপিং কোম্পানীর আরেকটি জাহাজ, নাম ‘অলেম্পিক’। বস্তুতঃ একটি দুর্ঘটনায় অলেম্পিক জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তখনই ঐ জাহাজের মালিক মরগ্যানের মাথায় এই চমৎকার(!) বুদ্ধিটি আসে। তিনি ‘টাইটানিক’ নামে একটি নতুন জাহাজ নির্মাণ শুরু করেন। টাইটানিককে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যেন এটা কোনো অবস্থাতেই কখনোই না ডোবে। অথচই এই জাহাজটিই এর প্রথম যাত্রাতেই ডুবে যাবে – এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য। কারণ বরফখণ্ডের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবেছে – এমন জাহাজ পৃথিবীর ইতিহাসে একটিই, আর সেটি হলো কথিত ‘টাইটানিক’। ষড়যন্ত্র তত্ত্ববাদীরা (কন্সপিরেসি থিওরিস্ট) বিশ্বাস করেন যে, টাইটানিকের নামে আসলে মেরামত করা অলেম্পিক জাহাজটিই পানিতে ভাসানো হয়েছিল, এবং পরবর্তীতে সেটা ইচ্ছাকৃতভাবে মধ্য আটলান্টিকে ডুবানো হয়েছিল। এ ব্যাপারে হয়তো জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং ক্রুগণ জড়িত ছিলেন। যাই হোক, জাহাজডুবির এ ঘটনায় মরগ্যান বীমা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অর্থ পান, যার দ্বারা তিনি তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে দেউলিয়া হওয়া থেকে বাঁচান। এ ঘটনায় নিরীহ মানুষ হতাহত না হলে হয়তো কারোরই কিছু বলার থাকতো না, কারণ আর্থিকভাবে লাভবান হবার জন্য এরকম কারচুপির উদাহরণ ইতিহাসে ভুরিভুরি। তবে টাইটানিক ট্র্যাজেডি’র বেলায় ব্যাপারটা আলাদা। ভুলে গেলে চলবে না যে, টাইটানিক ডুবিতে প্রায় দেড় হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। এতগুলো মানুষকে জেনেশুনে মৃত্যুমুখে ঠেলে দেয়া যে কত বড় অপরাধ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। ধারণা করা হয়ে থাকে, ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত একটি উপন্যাস পড়ে মরগ্যানের মাথায় টাইটানিক ডোবানোর বুদ্ধিটা আসে। ঐ উপন্যাসের নাম ‘রেক অফ দ্য টাইটান’। উপন্যাসের কাহিনী টাইটানিকের সাথে পুরোপুরি মিলে। অর্থাৎ জাহাজের নাম ‘টাইটান’, এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে কখনোই কোনো পরিস্থিতিতেই না ডোবে, অথচ সেটি তার প্রথম যাত্রাতেই সমুদ্রে অবস্থিত বিশাল এক বরফখণ্ডের সাথে ধাক্কা লেগে ডুবে যায় এবং এতে বিপুল প্রাণহানী ঘটে।



সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার

এই ভদ্রলোক হচ্ছেন নিকোলা টেসলা। অনেক বিজ্ঞ ব্যক্তি ওনাকে সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, উনি যদি সর্বকালের সেরা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে থাকেন, তাহলে বর্তমান সময়ে উনি এত অখ্যাত কেন? সায়েন্স বা বিজ্ঞান নিয়ে যারা সারাজীবন নাড়াচাড়া করেছেন, এমন অনেক ব্যক্তিও নিকোলা টেসলার নাম হয়তো কোনোদিন শুনেন নি, আর শুনলেও উনি যে আসলে কী কী কর্মকাণ্ড ও আবিষ্কার করেছেন, সে বিষয়ে পুরোপুরি অজ্ঞ। অনেকের ধারণা উনি তাড়িৎচৌম্বক তরঙ্গের বিষয়ে কিছু কাজকর্ম করেছেন – কিন্তু সেগুলো আসলে যে কী, সেটা সঠিকভাবে বলতে পারবে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। এমনকি যাঁরা তড়িৎ প্রকৌশল বা ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডিপ্লোমা বা গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী অর্জন করেছেন, তাঁরাও টেসলাকে একজন ছোটোখাট বিজ্ঞানী হিসেবেই চিনেন; তিনি যে আসলে আইনস্টাইনের সমপর্যায়ের একজন বিজ্ঞানী তথা সর্বকালের সেরা তড়িৎ প্রকৌশলী সেটা হয়তো বিলকুল জানতেন না বা ঘুণাক্ষরেও চিন্তা করেন নি।



জেনে রাখুন, ওনার অখ্যাত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো, উনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়নের এমন এক অঞ্চলে যা বর্তমানে ক্রোয়েশিয়া নামে পরিচিত। প্রাপ্তবয়ষ্ক হওয়ার পর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনা শেষে তিনি আমেরিকাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং সেখানেই তাঁর জীবনের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করেছিলেন। বিদ্যুৎ আবিস্কৃত হওয়ার পর সবচেয়ে মূল্যবান আবিষ্কারগুলো, যেমন – এসি জেনারেটর,  এসি মোটর, ট্রান্সফর্মার, ট্রান্সমিশন লাইন, রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ – এ সবকিছুই তাঁর হাত ধরে এসেছে (টেসলার রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ-ব্যবস্থার পেটেন্টের অবৈধ ব্যবহার করেন মার্কনি; এ বিষয়ে আমেরিকান আদালত প্রথমে মার্কনির পক্ষে রায় দিলেও পরবর্তীতে টেসলাই রেডিও সিগন্যাল প্রেরণ-ব্যবস্থা আবিষ্কারের যোগ্য দাবীদার বলে চূড়ান্তভাবে মেনে নেয়)। এমনকি বর্তমান যুগে ‘স্ট্র্যাটেজিক ডিফেন্স ইনেশিয়েটিভ’ নামে যে ব্যবস্থা প্রতিপক্ষ দেশের মিসাইল থেকে শুরু করে এটম বোমা পর্যন্ত আটকে দিতে পারে, সে ব্যবস্থা বা সিস্টেমের প্রথম রূপকার হলেন টেসলা (কথিত আছে যে, টেসলার মৃত্যুর পর আমেরিকান সরকার অবৈধভাবে তাঁর কাগজপত্রগুলো ব্যবহার করে উক্ত সিস্টেম ডেভেলপ করা শুরু করে, আর পরবর্তীতে রাশিয়া থেকে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তির উত্তরাধিকারী ভাইপো এসে তাঁর সেই কাগজপত্রগুলো নিয়ে গিয়ে রাশিয়ান সরকারের হাতে তুলে দেন, এভাবে রাশিয়াও উক্ত সিস্টেম ডেভেলপ করতে সমর্থ হয়)।

কর্মজীবনে এত অর্জন ও সাফল্য থাকা সত্ত্বেও উনি মৃত্যুর পর খুব একটা প্রচার পান নি। এর প্রধান কারণ হলো, উনি জন্মগতভাবে যেহেতু রাশিয়ার নাগরিক, তাই পশ্চিমা মিডিয়া বিশেষ করে আমেরিকান মিডিয়া ওনার নাম প্রচার করতে চায় নি। এছাড়া আরো একটা কারণ রয়েছে, সেটা খুলে বলা যাক। ওনার একবার নোবেল পুরষ্কার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, ১৯১০ সালে পদার্থবিজ্ঞানে; কিন্তু পুরষ্কারটা শেয়ার করতে হবে তথাকথিত অামেরিকান দেশপ্রেমিক বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের সাথে। এই ব্যক্তির সাথে টেসলার তীব্র দ্বন্দ্ব ছিল। দ্বন্দ্বের উৎপত্তি হয়েছিল টেসলা যখন এডিসনের কোম্পানিতে কাজ করতেন তখন থেকে। এডিসন টেসলাকে তাঁর ডিসি মোটরের পারফরমেন্স বাড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। টেসলা তাঁর দায়িত্ব সম্পন্নের পর যখন পারিশ্রমিক চাইলেন, তখন এডিসন তাঁর সাথে উপহাস করলেন এবং প্রতিশ্রুত অর্থের চেয়ে অনেক কম পারিশ্রমিক দিতে চাইলেন। এ অপমান টেসলা সহজভাবে নেন নি। তিনি অভিমান করে চাকুরি ছেড়ে দেন, ফলশ্রুতিতে পরবর্তী এক বছর তাঁকে মাটি কাটার কাজ করতে হয়। এমনকি টেসলা যখন সকল বাধাবিপত্তি পেরিয়ে সফল বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন, তখনো তাঁর সাথে নতুন করে এডিসনের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এবারের দ্বন্দ্বের কারণ এসি কারেন্ট আর ডিসি কারেন্ট নিয়ে মতবিরোধ। টেসলা ছিলেন এসি কারেন্টের সমর্থক, কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ডিসি কারেন্ট দিয়ে যে কাজগুলো সম্ভব নয়, সেগুলো এসি কারেন্ট দিয়ে সম্ভব, যেমন দূরদূরান্তে বিদ্যুৎ প্রেরণ করা। সুতরাং এই আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে নোবেল পুরষ্কার শেয়ার করা টেসলার পক্ষে সম্ভব নয় – এটা তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। এডিসনও অনুরূপ ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এডিসন যেহেতু জন্মসূত্রে আমেরিকান নাগরিক, আর টেসলা ছিলেন প্রবাসী থেকে নাগরিক, তাই আমেরিকান তথা পশ্চিমা মিডিয়ার সাপোর্ট ছিল এডিসনের পক্ষেই।

এই রচনার প্রথম অনুচ্ছেদে টেসলাকে আইনস্টাইনের সমপর্যায়ের বিজ্ঞানী বলা হয়েছে, এটি অতিরঞ্জিত কিছু নয়; কারণ দু’জনেই প্রায় সমান মেধাবী ছিলেন। এর মধ্যে টেসলা ছিলেন ব্যবহারিক বিজ্ঞানী অর্থাৎ তিনি বস্তুজগত নিয়ে কাজ করতেন আর আইনস্টাইন ছিলেন তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী। আইনস্টাইন যদিও টেসলাকে অনেক পছন্দ করতেন এবং সর্বদাই তাঁর প্রশংসা করতেন, তবে টেসলা আইনস্টাইনকে ভালো চোখে দেখতেন কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। একবার তো তিনি আইনস্টাইনকে উদ্দেশ্য করে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘আজকালকার তাত্ত্বিক বিজ্ঞানীরা গভীর চিন্তা করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁরা পরিষ্কার (সঠিক) চিন্তা করতে পারেন কিনা, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।’ টেসলার এই বক্তব্য নিতান্ত অমূলক নয়। আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্ব আবিষ্কারের বহুকাল পরে আইনস্টাইন নিজের হিসাবনিকাশগুলোর দিকে আরেকবার ভালো করে চোখ বুলান, তাতে তিনি একটি বৃহৎ ভুল দেখতে পান। এবার বুঝলেন তো, যেকোনো তত্ত্ব বা থিওরি যতই বিখ্যাত হোক না কেন, সেখানেও একটা ‘গোড়ায় গলদ’ থাকতে পারে।




যাই হোক, এবার টেসলার জীবনযাপন নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৮৫৬ সালে এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৯৪৩ সালে। জীবদ্দশায় তিনি অনেক অর্থ উপার্জন করেছিলেন, কিন্তু তিনি প্রায় সব অর্থই বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করেন এবং ব্যাংকে তেমন কোনো টাকাপয়সা রাখেন নি। যার ফলে শেষ বয়সে তাঁকে অনেক খারাপ সময় পার করতে হয়েছে, এমনকি যৌবনে যে কোম্পানিগুলোর জন্য তিনি কাজ করেছেন, সেগুলো থেকে তাঁকে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করতে হয়েছিল। ঐ সকল কোম্পানিগুলোর উত্থানের পেছনে তাঁর যে বিশাল অবদান ছিল, সে কথা মাথায় রেখেই তারা তাঁকে এই আর্থিক সাহায্যটুকু করতো।

নিকোলা টেসলা ৮৭ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন; আরো কিছুদিন হয়তো বাঁচতেন, কিন্তু উনার বয়স যখন ৮৩ বছর, তখন নিউইয়র্কের রাস্তায় একটা ট্যাক্সি তাঁকে আঘাত করে। এর কয়েক বছর পরেই রোগেশোকে ভুগে উনি মারা যান। পরিশেষে বলতে পারি, উনি হয়তো ক্রিশ্চিয়ান ছিলেন, তারপরও মানবতার কল্যাণে উনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে বিশাল অবদান রেখেছেন, সে কথা স্মরণ করে হলেও আমরা সকলে উনার রূহের মাগফিরাত (Redemption) ও শান্তি কামনা করতে পারি।

জেনে নিন ফেরাউন কে ছিলেন

ফেরাউনকে ইসলামের সকল অনুসারী (এবং সম্ভবত ইহুদীরাও) খারাপ চোখে দেখে। মজার ব্যাপার হলো, ‘ফেরাউন’ শব্দটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়, বরং এটি একটি বংশের নাম। দীর্ঘ একটা সময় (প্রায় কয়েকশত বছর) ধরে মিশরের সম্রাটকে ‘ফেরাউন’ বা ‘ফারাও’ বলা হতো। বংশ পরম্পরায় ক্ষমতায় আসা এই সম্রাটেরা নিজেদেরকে ‘ঈশ্বর’ বলে দাবী করতেন, ফলে মিশরের তৎকালীন অধিবাসীরাও ফারাওকে ঈশ্বর বলে মেনে নিতে বাধ্য হতেন। তবে ফেরাউন নামে যে ব্যক্তিটিকে মুসলমানেরা জানে তাঁর প্রকৃত নাম হলো ‘রেমেসিস’। শত্রু হবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি ছিলেন মুসা (আঃ)-এর পালক ভাই। আরো সঠিকভাবে বলতে গেলে, মুসা (আঃ) ছিলেন রেমেসিসের পালক ভাই, কারণ রেমেসিসের মা (সম্রাটের স্ত্রী) মুসা (আঃ)-কে নীল নদের কিনারে কুঁড়িয়ে পেয়ে তাঁকে লালনপালন করে বড় করেন।



তাঁরা দু’জন প্রায় সমবয়সী ছিলেন এবং একসাথেই বেড়ে উঠেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে, মুসা নবী ছোটকাল থেকেই প্রচণ্ড দুর্দান্ত ও দুষ্ট ছিলেন। তিনি প্রায়ই দুষ্টামি ও অঘটন ঘটিয়ে ভাই রেমেসিসের উপর এর দায়ভার চাপিয়ে দিতেন। এজন্য রেমেসিস ছোটকাল থেকেই ভিতরে ভিতরে মুসা নবীর প্রতি ক্ষেপে ছিলেন। তাঁরা দু’জন প্রায় সমবয়সী হলেও রেমেসিস মুসা নবীর চেয়ে বয়সে কিছুটা বড় ছিলেন, তাই রেমেসিসই ছিলেন সাম্রাজ্যের পরবর্তী দাবীদার। রেমেসিসের পিতা তথা তৎকালীন সম্রাট প্রায় সবসময়ই সিংহাসনের উত্তরাধিকারী তাঁর বড় পুত্রের উপর ক্ষেপে থাকতেন, কারণ তাঁদের দু’ভাইয়ের দুষ্টুমির বেশিরভাগ অভিযোগই রেমেসিসের নামে আসতো। সম্রাটের আশংকা ছিল এই যে, রেমেসিসের কারণেই হয়তো শতশত বছর ধরে চলে আসা তাঁদের পারিবারিক সংস্কৃতি ও রাজত্ব হুমকির মুখে পড়বে। অর্থাৎ তিনি বলতে চাইতেন, রেমেসিসের কারণেই ফেরাউন বা ফারাওদের রাজত্বের অবসান ঘটতে পারে। সম্রাট তাঁর নিজের পুত্রকে সর্বদাই আরো কঠোর ও সতর্ক হওয়ার জন্য বলতেন, কিন্তু তারপরও রেমেসিস প্রায়ই বিতর্কের মুখে পড়তেন।

এ ব্যাপারগুলো নিয়ে তিনি সর্বদাই বিব্রত থাকতেন, একারণে তিনি তাঁর পালক ভাই মুসা (আঃ)-কে কখনোই ভালো চোখে দেখতেন না। পরবর্তীতে মুসা নবী যখন নবুওয়্যত প্রাপ্ত হলেন, তখন রেমেসিসই ছিলেন মিশরের সম্রাট, কারণ তাঁদের পিতা ইতিমধ্যেই বিগত হয়েছেন। এসময় মুসা নবী যখন রেমেসিসকে আল্লাহ’র (একমাত্র স্রষ্টা) দাওয়াত দিলেন এবং বনী ইসরাইল বংশের লোকদেরকে ছেড়ে দিতে বললেন, তখন রেমেসিস তা অস্বীকার করলেন। আল্লাহ’র অস্তিত্বকে অস্বীকার করলেও তিনি তাঁর পালক ভাই মুসা’র অনুরোধে ঐ লোকগুলোকে ছেড়ে দিতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর বিগত পিতার কথাগুলো সবসময়ই তাঁর কানে বাজতো ‘তুমি হলে বংশের কুলাঙ্গার, তোমার কারণেই শতশত বছর ধরে চলে আসা আমাদের বংশীয় রাজত্ব ও ঐতিহ্যের পতন ঘটবে।’ এ কথাগুলো স্মরণ করেই রেমেসিস কঠোর অবস্থানে গেলেন এবং বনী ইসরাইল বংশের দাসদেরকে ছেড়ে দিতে অস্বীকার করলেন।

পরবর্তী ঘটনাসমূহ সবারই জানা। মিশরের উপর আল্লাহ’র গজব নেমে আসলো এবং ‘সোনা’র মিশর প্রায় শ্মশানভূমি হয়ে গেলো। রেমেসিস এরপরও চুপচাপ ছিলেন এবং এ ‘গজব’গুলো সহ্য করার চেষ্টা করলেন, অর্থাৎ মুসা নবীকে আটকের বা জানে মেরে ফেলার কোনো পদক্ষেপ তিনি নেন নি। কিন্তু আল্লাহ’র গজবের দরুণ যখন তাঁর স্বীয় নাবালক পুত্র মারা গেল, তখন তাঁর মাথা আউলা হয়ে গেল। তখন তিনি প্রথমতঃ বনী ইসরাইল বংশের লোকদেরকে ছেড়ে দিলেও পরবর্তীতে সৈন্যবাহিনী সাথে নিয়ে মুসা নবীসহ তাদের সবাইকে নীল নদের মধ্যে মেরে ফেলার চেষ্টা করলেন। এতে হলো কী, মুসা নবীসহ বনী ইসরাইলের লোকজন নদী পার হতে পারলেও ফেরাউন রেমেসিস তাঁর সৈন্যদলসহ সেখানে ডুবে মরলেন।