‘মা অন্যের সহায়তায় যেভাবে বাবাকে খুন করেছে, তা মেনে নিতে পারি না’

স্বামীকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১২ পৃষ্ঠার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন স্নিগ্ধা সরকার ওরফে দীপা ভৌমিক।

জবানিতে দীপা বলেছেন, দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অশান্তি, অবজ্ঞাসহ নানা কারণে স্বামী রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনাকে হত্যা করেছেন তিনি। দীপাকে এখন রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।

এদিকে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডে পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বাবুসোনার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে দীপ্ত ভৌমিক। ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেছেন  ‘ক্ষমা করে দিও বাবা …’।

একই সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবি করছেন ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষার্থী দীপ্ত। গণমাধ্যমে কথা বলতে গিয়ে দীপ্ত ভৌমিক আরও বলেন, অপরাধী কখনও আমার মা হতে পারে না। অপরাধী অপরাধীই, সে যেই হোক না কেন। আমি তার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমি আমার বাবার খুনিদের ফাঁসি চাই।

দীপ্ত বলেন, সব পরিবারেই তো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে মাঝেমধ্যে ঝগড়া হয়। আমাদের পরিবারেও হতো। কিন্তু আবার তা সমাধানও হয়ে যেত। কিন্তু মা অন্যের সহায়তায় যেভাবে বাবাকে খুন করেছে, তা মেনে নিতে পারি না।

তিনি বলেন, বাবা বলতেন, মানুষের সেবা করাই বড় ধর্ম। ভাবতেও পারিনি সহজ-সরল বাবার এমন পরিণতি হবে। সুন্দর সাজানো একটি সংসার তছনছ হয়ে যাবে।




দীপ্ত বলেন, বাবা বলতেন, তুমি আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে উকিল হও। সাধারণ মানুষের সেবা কর। তার ইচ্ছায়ই আমি আইন বিষয়ে লেখাপড়া করছি।

এদিকে রথীশ চন্দ্র হত্যার প্রধান আসামি তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের কথিত প্রেমিক কামরুল ইসলামকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দ্বিতীয় দিন ছিল শনিবার। জিজ্ঞাসাবাদে স্নিগ্ধাকে নিয়ে হত্যার ব্যাপারে পুলিশকে নানা তথ্য দিয়েছেন তিনি। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্যের সবটা সাংবাদিকদের বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।

উল্লেখ্য, পরিবারের দাবি অনুযায়ী গত শুক্রবার (৩০ মার্চ) সকাল সাড়ে ৬টায় বাসা থেকে বের হন নিহত আইনজীবী রথিশ চন্দ্র বাবু সোনা। কিন্তু পুলিশের ধারণা বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে দশটা থেকেই নিখোঁজ ছিলেন তিনি। কারণ বৃহস্পতিবার রাত দশটা ২২ মিনিটে সর্বশেষ তিনি মোবাইল ফোনে কথা বলেন। তখন তার অবস্থান ছিল স্টেশন এলাকায়। সেই থেকে তার ফোন বন্ধ ছিল। কিন্তু রথিশের স্ত্রীর পুলিশ-র‌্যাবকে জানায় শুক্রবার সকাল সাড়ে ছয়টার একটি মোটর সাইকেলে চেপে চলে যান। আসলে রতিশ চন্দ্র নিখোঁজ ছিলেন বৃহস্পতিবার রাত থেকেই। তাকেই ওই রাতেই হত্যা করে একটি বাড়ির মাটিতে পুঁতে রাখা হয়।

জানা গেছে, ক্লুবিহীন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে চরম অন্ধকারে পড়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাঁচ দিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি-জামায়াত, জমিজমা বিরোধ, ব্যক্তিগত এবং হিন্দু ট্রাস্ট নিয়ে কাজ শুরু করেন তারা। উদ্ধার না হওয়ায় নানা কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে উঠে রংপুর।

এদিকে, দফায় দফায় পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এবং রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক রথিশের বাড়িতে যান। সেখানেই তাদের প্রাথমিক সন্দেহ হয়। জানা গেছে, পুলিশ কয়েক দফায় রথিশের স্ত্রী সন্তানের সঙ্গে কথার বলার সময় অনেকটা স্বাভাবিক ছিলেন। নিখোঁজের বিষয়টিতে তারা খুব একটা আমলে নেননি।

এদিকে র‌্যাব ও পুলিশের একটি সুত্র জানায়, পরে তারা পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তে নামেন। এরপর পুলিশ বাবু সোনার স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে। কললিস্ট দেখে আঁতকে উঠেন পুলিশ। প্রতিদিন প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলতেন। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে শনিবার রাতে নগরীর রাধাবল্লভের বাড়ি থেকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয় কামরুল ইসলামকে। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানায় কামরুল।

মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব বাবু পাড়ার বাড়ি থেকে স্নিগ্ধা ভৌমিককে গ্রেফতার করে। তাদের দেয়া তথ্য পেয়ে র‌্যাব মঙ্গলবার রাতে সোয়া একটার দিকে বাবু সোনার বাবুপাড়ার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে মোল্লাপাড়ায় খাদেমুল ইসলাম জাফরীর নির্মাণাধীন বাড়ির মেঝে থেকে লাশটি উদ্ধার করে।

রথীশের দুই ছেলে-মেয়ে। ছেলে দীপ্ত ভৌমিক ঢাকায় একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে শেষ বর্ষের ছাত্র। তিনি ঢাকায় ছিলেন। আর মেয়ে রিক্তি রানী ভৌমিক রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যাণ্ড কলেজেন নবম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। ঘটনার রাতে সে তার এক পিসির (ফুপু) বাসায় ছিল। বাবার নিখোঁজের খবর পেয়ে বাসায় আসেন দীপ্ত ভৌমিক।



এদিকে বাবুসোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিক রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ১০০ নারী বন্দির সঙ্গে একটি কক্ষে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বেশিরভাগ সময় উদাস মনে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইছেন। আবার কখনো কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। নিজের অপকর্মকে ভুল মনে করে অনুতপ্ত তিনি। কোনো বন্দির কাছে পান সুপারি থাকলে তা চেয়ে নিয়ে খাচ্ছেন। তবে জেলাখানার খাবার দীপা অন্যান্য বন্দিদের মতো স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করছেন। অনেক সময় চিন্তিত মনে গভীর রাত পর্যন্ত পায়চারি করছেন। যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছে সেই কক্ষের অন্য বন্দিরা তাকে কিছুটা বাঁকা দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করেছেন। অনেক বন্দিই তাকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। কারাগারের একটি নির্ভরশীল সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।

বাবুসোনাকে হত্যার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন বাবুর স্ত্রী দীপা ভৌমিক, তার প্রেমিক কামরুল ইসলাম, আইনজীবীর সহকারী মিলন মহন্ত, সবুজ ইসলাম ও রোকনুজ্জামান। এদের মধ্যে ৪ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কামরুলকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.