পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যাবার সময় যখন হয়

ধনী-গরীব, উঁচু-নিচু সবাইকে একসময় এ পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যেতে হয়। সবকিছুর যেমন শুরু থাকে, তেমনি শেষও থাকে। এ চরম সত্যটা সবাইকে মেনে নিতে হয়। মানুষ এমনভাবে দুনিয়ার কাজকর্মে মশগুল থাকে যে, মনে হয় তাদেরকে কোনোদিন দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে না। অথচ সত্যটা হলো এই যে, কে কখন এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবে, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সদ্য পিতা হয়েছেন যে বাবা, তিনি তার সন্তানকে চুমু খেয়ে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন; কোনো গ্যারান্টি নেই যে, প্রিয় সন্তানটিকে তিনি আবার দেখতে পাবেন, এমনই নিষ্ঠুর এ দুনিয়ার বাস্তবতা। তাই বলি জেনেশুনে কারো মনে দুঃখ দিয়েন না।

অনেকদিন আগে একটা এনিমেটেড মুভি দেখেছিলাম ‘The Wild Thornberrys’ নামে। সেখানে ‘ডিবোরাহ’ নামে একটি চরিত্র আছে, একটি কিশোরী মেয়ে। তার একটি পালিত শিম্পাঞ্জী থাকে, নাম ‘ডারউইন’। একবার আফ্রিকার জঙ্গলে গুরুতর অসুস্থ এক তান্ত্রিককে সাহায্য করেছিল ডিবোরাহ, তখন তান্ত্রিক খুশি হয়ে তাকে একটি বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেন, সেটি হলো যেকোনো পশুপাখির কথা বুঝতে পারা। তাই ডিবোরাহ অনায়াসে সবসময় তার পোষা শিম্পাঞ্জী ডারউইনের সাথে কথা বলতো। কিন্তু একবার ডারউইনের সাথে ডিবোরাহ’র মনোমালিন্য হলো, সে খুব কড়া কড়া আর কটু কয়েকটা কথা শুনিয়ে দিলো ডারউইনকে। ঠিক এর পরপরই দুর্ঘটনাক্রমে এই বিশেষ ক্ষমতাটা হারিয়ে ফেলে ডিবোরাহ। তখন সে এই বলে আফসোস করতে থাকে যে, ডারউইনের সাথে তার শেষটা ভালো হলো না, কারণ এখন সে ওকে ‘সরি’ও বলতে পারছে না। তাই বলি, কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করার আগে একবার অন্ততঃ ভেবে নিন যে, তার সাথে আর কথা বলা বা দেখা করার সৌভাগ্য আপনার নাও হতে পারে। মৃত্যু সম্পর্কিত এ সিরিয়াস চিন্তাভাবনাগুলো মাথায় আসলো জনি ক্যাশ-এর ‘হার্ট’ গানটা শুনে, যেটা উলভারাইন-এর শেষ ছবি ‘লোগান’-এর শেষে দেয়া হয়েছে। আসলে এটিই ছিল উলভারাইন হিসেবে হিউ জ্যাকম্যানের শেষ ছবি, তাই এমন একটা মর্মান্তিক গান! ইউটিউবে খোঁজ নিয়ে গানটির অরিজিনাল ভার্সন শুনলাম, যারপরনাই ভালো লাগলো।

গানটিতে অশীতিপর বৃদ্ধ জনি ক্যাশ তাঁর নিজের জীবনের কাহিনীই বর্ণনা করেছেন।  তিনি নিজের শরীরে একটি পিন ফুটিয়ে দেখলেন যে, তাঁর শরীরে এখনো অনুভূতি বলতে কিছু আছে কিনা। হ্যাঁ, তীব্র একটা ব্যথা অনুভব করলেন, যার দ্বারা বুঝতে পারলেন শরীরে এখনও অনুভূতি আছে। এরপর একে একে পুরনো দিনের স্মৃতিগুলো সব মনে পড়লো তাঁর। তিনি জীবনে অনেক কিছুই করেছেন, অনেক সাফল্য-ব্যর্থতা দেখেছেন, তাঁর পরিচিতরা সবাই একে একে তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন (মারা গেছেন)। শেষ বয়সে এসে কেবলই ধূসর স্মৃতিগুলো মনে পড়ে তাঁর। এখন তিনি আর্তকণ্ঠে এটাই বলতে চান যে, এমন জীবন হয়তো তিনি চান নি।  তাই আরেকবার জীবন শুরু করার সুযোগ পেলে তিনি নিজের জীবনটাকে হয়তো অন্যভাবে সাজাতেন; হয়তো মিলিয়ন মাইল দূরে কোথাও নিবিঢ় প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতেন, তেমনই ঈঙ্গিত দিয়েছেন ঐ গানে। কিন্তু আমরা জানি এমনটা হবার নয়। শেষে যীশুখ্রিস্টের ক্রুশবিদ্ধ অবস্থার কয়েকটি দৃশ্য ছিল গানটিতে, অর্থাৎ ক্রুশবিদ্ধ করার মুহূর্তে যীশুর চেহারায় তীব্র বেদনার যে ছাপ পড়ে তা দেখানো হয়েছে। এর দ্বারা কী বোঝাতে চেয়েছেন, সেটা বুঝতে পারি নি। হয়তো গায়ক বলতে চেয়েছেন, এ জীবনে তিনিও ততটাই কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন এবং যীশুখিস্টের মতোই এক স্বর্গীয় মৃত্যু ও পরকাল চান তিনি। গায়ক এক পর্যায়ে এও বলেছেন, ‘আমি কাঁটার মুকুট পরে আছি।’ বাস্তবিকে, যীশুর ক্রুশিফিকেশনের সময়ও তাঁর মাথায় একটা কাঁটার মুকুট পরানো হয়েছিল। গায়ক বললেন, ‘সারাজীবন যে সাম্রাজ্য সাজিয়েছি, সেটাকে এখন কেবল ধুলোর সাম্রাজ্যই মনে হচ্ছে। তোমরা যে কেউ নিয়ে যাও আমার এ সাম্রাজ্য!’

যা হোক, গানটা চাইলে আপনারা নিজেরাও শুনতে পারেন, নিচে লিংক দেয়া হলোঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.