পহেলা বৈশাখ নিয়ে বিতর্কের কারণ

বাংলা সনের জন্ম দিয়েছিলেন মোগল সম্রাট আকবর, ৯৬৩ হিজরি সন হিসাব করে তার সিংহাসনে আরোহণের দিনকে নির্দিষ্ট করে। তিনি সম্ভবত বাংলা সনটি প্রণয়ন করেছিলেন রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে।

কিন্তু কথা হল, একজন মানুষ একটি সন চালু করলেন আর অমনি সেই সনটি চালু হয়ে গেল বিষয়টি তো আসলে সে রকম নয়। বঙ্গাব্দ নামে বাংলা সনটি জনপ্রিয় হতে বেশ খানিকটা সময় লেগেছিল।

এটির গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হতে থাকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়। সে সময় নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ খাজনা আদায় করার লক্ষ্যে ‘পুণ্যাহ’ অনুষ্ঠান প্রবর্তন করেছিলেন। সেই সঙ্গে তখনকার বণিক সম্প্রদায় তাদের বকেয়া পাওনা আদার করার জন্য হালখাতা নামক অনুষ্ঠানের রীতিও চালু করে।

তবে সাড়ম্বরে বাঙালি সমাজে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের প্রচলন শুরু হয় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে। প্রখ্যাত লেখিকা কল্যাণী দত্ত তার ‘সেকালের নববর্ষ’ লেখাটিতে লিখেছেন- ইন্দিরা দেবীর সঙ্গে প্রমথ চৌধুরী এবং আশুতোষ চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিভা দেবীর বিবাহের পর থেকেই নববর্ষে নতুন কাপড় পরা এবং গুরুজনদের প্রণাম করার রীতি চালু হল।

পহেলা বৈশাখ তখনকার দিনে ব্যবসায়ীদের দিন হিসেবেই গণ্য করা হতো। খুব সকালে, প্রায় রাত থাকতে ব্যবসায়ীরা খাতা-রোকড় সব নিয়ে কালীঘাটের মায়ের মন্দিরে হাজির হতেন।

মা কালীর চরণে পুরুত ঠাকুর সেসব খাতা ছুঁইয়ে দিতেন, গদিতে তেল সিঁদুর দিয়ে ঋত্বিক এঁকে দিতেন। হালখাতা ছিল সেই উৎসবের নাম। সন্ধেবেলা মুদি দোকান, গয়নার দোকানে হালখাতার নেমন্তন্ন থাকত। বাড়ির বড়দের সঙ্গে গিয়ে মিষ্টি আর রঙিন শরবত খাওয়া চলত।




রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোনঝি অর্থাৎ স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা সরলা দেবী চৌধুরানীও স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন- তখন ঠাকুরবাড়িতে ১১ই মাঘ ছাড়া কোনো উৎসব ছিল না। কিন্তু পরবর্তীকালে এই ঠাকুরবাড়ি থেকেই পহেলা বৈশাখ, নবান্নের উৎসবসহ নানারকম পালাপার্বণ ও বিবিধ কৃষ্টি কালচার উদযাপনের উৎপত্তিস্থল হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।

এর পেছনে বড় একটি কারণ হল সে আমলে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে ঠাকুর পরিবারটি সমাজ থেকে ছিল অনেকটা বিচ্ছিন্ন ও একঘরে। কেন? সে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি।

আমাদের সমাজের অনেক শিক্ষিত লোকই হয়তো জানেন না যে, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার আসলে হিন্দু ছিলেন না। ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। ব্রাহ্মধর্ম একটি নতুন ধর্ম।

ধর্মটির গোড়াপত্তন করেছিলেন মূলত রাজা রামমোহন রায়। সঙ্গে তার সহযোদ্ধা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্ন কুমার ঠাকুর, কালীনাথ রায় ও আরও অনেকে।

ব্রাহ্মধর্মের মূল ভিত্তি ছিল পৌত্তলিকবিরোধিতা ও একেশ্বরবাদে বিশ্বাস। ব্রাহ্মধর্মের অনুসারীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল একেশ্বরবাদকে বিশ্বজনীন হিসেবে প্রচলন করা। সেদিক থেকে বিচার করলে ব্রাহ্মধর্মটি কিন্তু খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের অনেক কাছাকাছি।

রাজা রামমোহন রায় ও প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর ছিলেন এ দুটি ধর্মের প্রতি প্রচ্ছন্নভাবে অনুরক্ত। বলাই বাহুল্য যে, এরা দু’জনই আরবি ও ফারসি ভাষাগুলোতে এতটাই পণ্ডিত ছিলেন যে, সে সময়ের আরবি ও ফার্সিতে দক্ষ বহু মুসলমান মাওলানারাও এদের দু’জনের সমকক্ষ ছিলেন না। পাঠকদের মধ্য থেকে কেউ যদি জোড়াসাঁকোতে গিয়ে থাকেন তাহলে নিশ্চয়ই দেখে থাকবেন যে, ঠাকুরবাড়ির প্রবেশ মুখে মাঝারি গোছের একটি উপাসনালয় আছে। ব্রাহ্মধর্মের ওই উপাসনালয়টি কিন্তু দেখতে অনেকটা মসজিদের মতো।

মসজিদের যেমন সামনের দিকে কেবলা মুখ করে একটি মিহরাব থাকে সেরকম আর কী। আবার সেই মিহরাবে মাওলানারা মিমবারে বসে যেমন খুতবা পাঠ করেন, আমি নিজ চোখে দেখেছি ঠাকুরবাড়ির সেই উপাসনালয়ে সে রকম একটি মিমবারও আছে সিমেন্টের তৈরি। আমার ধারণা মিমবারের ওই বেদিতে বসেই সে সময় ব্রাহ্মধর্মের বইপুস্তক পাঠ করা হতো।

সে যাক, এই ধর্মগত কারণেই ঠাকুর পরিবারটি ছিল হিন্দু সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন। একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, সে সময়ের হিন্দু সমাজ ছিল অনেক গোঁড়া ও কট্টর। হিন্দু ধর্মের লোকজন অন্য ধর্মের লোকজনের সঙ্গে ওঠা-বসা, সমাজ-আমাজ করা তো অনেক দূরের কথা স্বয়ং নিজ ধর্মের নীচু জাতের লোকজনের ছায়া পর্যন্ত তারা মাড়াতেন না কখনও।



দৈবাৎ সে রকম কিছু ঘটলে তাদের জাত যেত। এ জন্য কলকাতার সে সময়ের অন্যতম সেরা ধনী হওয়া সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবারের সঙ্গে তখনকার সমাজের লোকজনদের ওঠা-বসা, চলন-বলন হতো খুবই কম। ফলশ্রুতিতে ঠাকুরবাড়ির লোকজন নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিল নানারকম সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।

গানবাজনা, নাটক মঞ্চায়ন, পত্রিকা প্রকাশ, পোশাক-পরিচ্ছদ-ফ্যাশন সব কিছুতে ছিল তাদের নব-নব সব উদ্যোগ। ফলে একসময় দেখা গেল ঠাকুরবাড়ির লোকজন যা-ই করছে না কেন পুরো কলকাতার মানুষ সেগুলোই অনুসরণ ও অনুকরণ করতে থাকে। একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি- এই যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সেকালের সবার মুখে লম্বা লম্বা দাড়ি রাখার প্রবণতা দেখি সেটিও কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরই প্রথম প্রচলন করেছিলেন।

একবার ঠাকুরবাড়িতে যাত্রা হবে নাম- ‘নববাবুবিলাস’, সেখানে ঠাকুরবাড়ির সবাইকেই কিছু না কিছু অভিনয় করতে হবে। ঈশ্বরচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ইনি আবার মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটবেলার বন্ধু তাকে বলা হল দারোয়ান সাজতে হবে।

তাও আবার পরচুলা-টরচুলা পরে নয় আসল দাড়ি-গোঁফ গজিয়ে। তখন দাড়ি রাখার কোনো ফ্যাশন ছিল না। সবাই গোঁফ রাখতেন কিন্তু দাড়ি কামিয়ে ফেলতেন।

ঈশ্বরবাবু বলতে শুরু করলেন- আমি তো দাড়ি গজাতে শুরু করলুম, মাঝখানে সিঁথি কেটে দাড়ি ভাগ করে গালের দু’দিক দিয়ে কানের পাশ অবধি তুলে দিই। সেই আমার দেখাদেখি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দাড়ি রাখলেন।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের যেই-না দাড়ি রাখা, কী বলব ভাই, দেখতে দেখতে সবাই দাড়ি রাখতে শুরু করলে, আর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো সোনার চশমা ধরল। সেই থেকে দাড়ি আর সোনার চশমার একটা চল শুরু হয়ে গেল। শেষে ছোকরারা পর্যন্ত দাড়ি আর চশমা ধরল। এবার বুঝলে তো ভাই কোত্থেকে এই দাড়ির উৎপত্তি? এই বলে ঈশ্বরবাবু খুব গর্বের সঙ্গে বুকে হাত দিয়ে নিজেকে দেখাতেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে কেন সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি। আমি মনে করি এর সঙ্গে দুটি দিক জড়িত। প্রথমত অনেক কট্টর ও গোঁড়া মুসলমানদের ধারণা পহেলা বৈশাখ হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

আসলে বিষয়টি কিন্তু আদৌ সত্য নয়। সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন খাজনা আদায়ে সুবিধা ও সুষ্ঠুতার জন্য। সম্রাটের আদেশে তৎকালীন বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেউল্লাহ সিরাজি সৌরসন শকাব্দ ও আরবি হিজরি এ দুটি সনের মিশ্রণে নতুন বাংলা সন বিনির্মাণ করেছিলেন।

এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন আসতে পারে খাজনা আদায়ের জন্য নতুন একটি সনের প্রয়োজন কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায় করা হতো আরবি হিজরি সন অনুযায়ী অথচ ফসল উৎপাদিত হতো সৌরসন অনুযায়ী। আমরা সবাই জানি যে, হিজরি সন হল চাঁদের হিসাবে।



হিজরি চান্দ্রসন হওয়ায় এ সনের দিনের সংখ্যা ৩৫৪। অন্যদিকে সে সময়ের শকাব্দ নামে যে সৌরসন ছিল, দিনের হিসাবে সেটা-৩৬৫। অর্থাৎ চান্দ্রসন সৌরসনের চেয়ে ১১ দিন কম।

এই জন্যই আমরা দেখি প্রতিবছর রোজা কিংবা ঈদ নির্ধারিত দিনের চেয়ে ১১ দিন কমে আসে। ফলে ঈদ কখনও কনকনে শীতে আবার কখনও কাঠফাটা গ্রীষ্মে উদযাপিত হয়।

ফসল চক্র সৌরসনের রীতি মেনে চলায় আদায়কৃত খাজনার হিসাব ও রাজকোষ মিলাতে গরমিল হতো। দেখা যেত হিজরি সনের যে মাসে যে ফসলে খাজনা হিসেবে জমা হয়েছে সেই একই মাসে তিন চার বছর পর অন্য ফসল জমা হয়েছে।

যেমন তিন বছর আগে মহররম মাসে আউশের ফসল আউশ ধান জমা হয়েছে (ঋতুভিত্তিক মাস শ্রাবণ) তিন বছর পর মহররম মাস এসেছে ঋতুচক্রে আষাঢ়ে। তখন মহররম মাসে তিলের ফসলের খাজনা জমা হয়েছে। আবার হিজরি সনের মাস নির্দিষ্ট রেখে খাজনা আদায় করতে হলে কোনো কোনো সময় দেখা যেত তা ফসল বপনের সময়, কর্তনের সময় নয়।

বাংলা সন গণনা শুরু হয় মোগল সম্রাট মহামতি আকবরের সিংহাসনের বছর থেকে আর সেটি ছিল ৯৬৩ হিজরি খ্রিস্টাব্দ মতে ১৫৫৬। তবে এ গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আরও কিছুটা পেছন থেকে।

এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি আর একটি অদ্ভুত কাজ করেন- ৯৬৩ হিজরিতে কাগজ কলমে বাংলা সনকে কার্যকরী দেখালেও আরবি হিজরি সনের ৯৬৩ বছরও নতুন জন্ম হওয়া এই বাংলা সনের সঙ্গে যোগ করে দেন। ফলে বাংলা সনটি জন্মানোর সঙ্গে সঙ্গে এর বয়স হয় ৯৬৩ বছর।

ফতেহউল্লাহ হিজরি ও বাংলা সনের বয়স একই রেখেছিলেন সম্ভবত এ কারণে যে এ দুটি সনই যেন সমগতিতে একসঙ্গে চলতে পারে। কিন্তু তার মাথায় এ বিষয়টি এসেছিল কিনা আমি বলতে পারব না।

হিজরি বছর চান্দ্রসন হওয়ায় সেটা হয় ৩৫৪ দিনে আর বাংলা সন সৌর সন হওয়ায় সেটি ৩৬৫ দিনে ফলে হিজরি সন প্রতি বছর ১১ দিন করে কমে আসে আর সে জন্য বর্তমানে বাংলা সনের চেয়ে হিজরি সন ১৭ বছর অগ্রগামী।

বর্তমানে হিজরি সন হচ্ছে ১৪৩৮ অন্যদিকে বর্তমানে বাংলা সন চলে ১৪২৩। বাংলা সনটি হিজরি হিসাব মতো হলেও সিরাজি সাহেব মাসের নামগুলো কিন্তু ধার করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের বহুল প্রচলিত এক প্রাচীন সৌরঅব্দ-‘শকাব্দ’ থেকে।

শকাব্দ সনের জন্ম হয়েছিল প্রাচীন এক নৃপতি শালীবাহনের প্রয়াণ দিবসকে উপলক্ষ করে। শকাব্দ সনটি চালু হয় খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৮ বছর পর। অর্থাৎ শকাব্দ নামের এই সনটি খ্রিস্টাব্দের চেয়ে ৭৮ বছরের ছোট। তবে শকাব্দে ব্যবহৃত মাসের বেশিরভাগই খ্রিস্টপূর্ব চার হাজার বছর আগে বিশেষ করে বৈদিক যুগে প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের দেয়া ২৭টি নক্ষত্রের নাম থেকে ধার করা।

২৭টি নক্ষত্রের কয়েকটির নাম এ রকম- চিত্রা, বিশাখা, অশ্বিনী, পৌষী ইত্যাদি। এসব নিয়ে নানারকম মিথও চালু আছে প্রাচীন সাহিত্যে। পুরাণ মতে চিত্রাসহ মোট ২৭টি নক্ষত্র হচ্ছে দক্ষ প্রজাপতির সুন্দরী কন্যা।

বাংলা সনের শেষ মাস চৈত্রের নামকরণ করা হয়েছে এই চিত্রা নক্ষত্রের নাম অনুসারে। প্রবাদতুল্য সুন্দরী এই কন্যাদের বিয়ে দেয়ার চিন্তায় ভারি উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠলেন দক্ষ প্রজাপতি। উপযুক্ত পাত্রী চাই।

কোথায় পাওয়া যায় সে রকম পাত্র। তাহলে কি অনূঢ়াই থেকে যাবে তারা? অবশেষে পাওয়া গেল সেই উপযুক্ত পাত্র। একদিন মহাধুমধামে চন্দ্রদেবের সঙ্গে বিয়ে হল দক্ষের ২৭ কন্যার। দক্ষের এ ২৭ কন্যার মধ্যে অনিন্দ সুন্দরী অথচ খরতাপময় মেজাজ সম্পন্ন একজনের নাম বিশাখা। এই বিশাখা নক্ষত্রের নাম অনুসারেই বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের নামকরণ।

এ প্রসঙ্গে স্বভাবসিদ্ধভাবেই আরেকটি বিষয় সামনে চলে আসে। যদি হিজরি সন মেনেই বঙ্গাব্দ সনটি চালু হয়ে থাকে তাহলে বৈশাখকেই বা কেন বছরের প্রথম মাস হিসেবে গণনা করতে হল।

এরও যথার্থ এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি উত্তর রয়েছে তবে এর আগে অন্য প্রসঙ্গে একটু করে বলতে হয়। প্রাচীনকালে ভারতীয় এ উপমহাদেশে একেক অঞ্চলে একেক মাসে নববর্ষ উদযাপিত হতো।

যেমন বৈদিক যুগে সম্ভবত নববর্ষ হতো অগ্রহায়ণ মাসে, কেন? এর উত্তর নিহিত আছে এর নামের মধ্যেই। অগ্র-অর্থ হচ্ছে আগে আর হায়ন মানে হচ্ছে বছর। অর্থাৎ অগ্রহায়ণ মানে হচ্ছে বছরের শুরুর যে মাস।

উত্তর ভারতে এখনও নববর্ষ পালিত হয় চৈত্র মাসের শুক্লা প্রতিপদে। বিশিষ্ট লেখক শ্রী যোগেশচন্দ্র রায় মহাশয়ের মতে অতি প্রাচীনকালে ফাল্গুনী পূর্ণিমা তিথিতে নববর্ষোৎসবের অনুষ্ঠান হতো। বঙ্গাব্দ সনের শুরু বৈশাখ মাস দিয়ে এর কারণ যেদিন থেকে বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয়েছিল অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরির প্রথম মাস জমাদিউল আওয়াল ছিল বৈশাখ মাসে।

আর এ কারণেই বাংলা সনের প্রথম মাস হয়ে গেল বৈশাখ। এর সঙ্গে হিন্দু কিংবা অন্য ধর্মের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। এ প্রসঙ্গে চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তার ‘হিন্দুর আচার-অনুষ্ঠান’ গ্রন্থের ৮৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- ‘বাঙালি সাধারণ হিন্দু গৃহস্থের মধ্যে পহেলা বৈশাখ নববর্ষের সূচনায় বিশেষ কোনো শাস্ত্রীয় বা লৌকিক অনুষ্ঠানের প্রচলন নেই।

যেসব গ্রন্থের দ্বারা আমাদের ধর্মানুষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হয় তাহাদের মধ্যে নববর্ষ প্রসঙ্গে কোনোরূপ ধর্মানুষ্ঠানের বিধান দেখিতে পাওয়া যায় না। পঞ্জিকায় এ সম্পর্কে যে শাস্ত্রীয় নির্দেশ উদ্ধৃত হইয়া থাকে তাহার উৎস অজ্ঞাত।’

আরেকটি বিষয় মনে রাখা বিশেষভাবে প্রয়োজন যে- হিন্দু সম্প্রদায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সন অনুসরণ করে পালন করে না। তাদের অনুষ্ঠানাদি পালিত হয় রাশিচক্রের নক্ষত্র ও চন্দ্রের তিথি গণনায়। এ ক্ষেত্রে তাদের পূজা-পার্বণ শকাব্দ অনুসারী।

সম্রাট আকবর এ সন প্রবর্তন করলেন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার্য খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনে বাংলা সন অনুসরণে তাদের কখনও বাধ্য করা হয়নি।

পহেলা বৈশাখকে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আরেকটি কারণ হয়তোবা আমার মতে- হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন। কারণ চৈত্রসংক্রান্তি পালন করা হয় চৈত্র মাসের একেবারে শেষ দিন।

আর তারপরই আসে পহেলা বৈশাখ। মুসলমানদের মধ্যে কতজন এটা জানেন আমি ঠিক বলতে পারব না। হিন্দু ধর্মে প্রায় প্রতি মাসের শেষেই একটি করে সংক্রান্তি পালিত হয়। যেমনম- চৈত্র, আশ্বিন, ভাদ্র, অগ্রহায়ই, পৌষ প্রভূত সংক্রান্তি এবং প্রতিটি সংক্রান্তিতেই পূজা-পার্বণের ব্যবস্থা থাকে। যেমন চৈত্র সংক্রান্তিতে ছাতুদান ও ছাতু খাওয়ার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।

আশ্বিনসংক্রান্তিতে চাষীরা প্রত্যুষে কাঁচা হলুদ বাটা সরষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ধানের ক্ষেতে ছিটিয়ে দিয়ে বলে- ধান রে সাধ খা/পাইক্যা ফুইল্যা ঘরে যা। আসলে সংস্কৃতি বিষয়টি বেশ গোলমেলে ও জটিল একটি বিষয়।

এসব বললেই তো অনেকে আমার নিন্দেমন্দ করবেন তারপরও বলছি। এই যে আমরা প্রতিবছর শীত মৌসুমে দলবেঁধে গাড়ির বহর সাজিয়ে বনভোজনে যাই, কেউ কি বলতে পারেন কোত্থেকে এসেছে এই সংস্কৃতি।

পৃথিবীর অন্য কোথাও কি এভাবে বনভোজন করার রীতি আছে? না নেই। এটা এসেছে হিন্দু পৌষসংক্রান্তি উদযাপন থেকে। লেখক চিন্তাহরণ চক্রবর্তী তার ‘ধর্ম সংস্কৃতি সমাজ’ বইটিতে লিখেছেন- পৌষ মাসের সংক্রান্তির দিনের পৌষপার্বণই সবচেয়ে বেশি প্রসিদ্ধ।

এ উপলক্ষে নানা স্থানে নানারূপ খুঁটিনাটি অনুষ্ঠানের প্রচলন দেখা যায়। ছেলেরা বাড়ি বাড়ি ঘুরিয়া হোলবোল, কুলাইর ছড়া, বাঘের বয়াত গান করে এবং খাদ্যদ্রব্য সংগ্রহ করিয়া ‘পৌষালা’ বনভোজনের ব্যবস্থা করে। আবার অন্যদিকে লেখক দীনেশচন্দ্র সেন থেকে শুরু করে সুকুমার সেনসহ বহু পণ্ডিতদের মতে হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা এই যে উলুধ্বনি দেন এটি তারা ধার করেছেন মুসলমানদের কাছ থেকে। এ ধরনের আরও বহু দৃষ্টান্ত আমি এখানে দিতে পারি।

তাহলে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কেন এত বিতর্ক। আমার মতে এর প্রধান কারণ সম্ভবত, দেশের কতিপয় বুদ্ধিজীবী মহল গির্জা, মন্দির, প্যাগোডায় গিয়ে তাদের প্রগতিশীলতা জাহির করতে এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করেন না।

কিন্তু ইসলামিক কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করলেই মনে হয় যেন তাদের সব প্রগতিশীলতা উবে যায়। তাদের এ ধরনের হীনমন্যতা ও বিবেকবোধহীন কর্মকাণ্ডের জন্যই যে অনুষ্ঠানটি উদযাপিত হওয়ার কথা ছিল সার্বজনীনভাবে অথচ সেটি আজ প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত।

আরেকটি কথা, ধর্মকে বাদ দিয়ে কী কখনও সংস্কৃতি হয়? সেটি হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ যে ধর্মের কথাই আমরা বলি না কেন। আগেই আমি লেখিকা কল্যাণী দত্তের কথা উল্লেখ করেছি। ভারতের কলকাতায় কি মুসলিম রীতিতে নববর্ষ উদযাপিত হয়?

যে দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মুসলমান সেখানে পহেলা বৈশাখকে সার্বজনীন করতে হলে ইসলাম ধর্মের কিছু অনুসঙ্গ সম্পৃক্ত করার কথা ভাবা যেতে পারে- এ উৎসবটির সঙ্গে, তা না হলে এটিকে কোনোদিনও সার্বজনীন করা যাবে না। ফলে আমরা চাই বা না চাই জাতিগত বিভক্তি দিন কে দিন বেড়েই চলবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.