নিজের মেয়ে, বোন আর ভাগ্নি বিয়ে দেয়া ছাড়া বাঙালীরা আর কিছুই বোঝে না

এই আর্টিক্যালটির বেশিরভাগ অংশ লিখেছিলাম আজ (২৪ মে ২০২০) হতে প্রায় এক বছর আগে, ২০১৯ সালের মে মাসে। সেখানে আমার বড় শ্যালক ড. মামুনের কথা উল্লেখ রয়েছে। সম্প্রতি সে ৩৯তম বিসিএস এর ওয়েটিং লিস্ট থেকে সহকারী সার্জন হিসেবে নিয়োগ পেয়েছে। এ মাসের ১২ তারিখে জয়েন করেছে ঝালকাঠি সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে সংযুক্ত থেকে। তার হোম ডিসট্রিক্ট ঝালকাঠি (বৃহত্তর বরিশালে)। জয়েনের পর তার পুলিশ ভেরিফিকিশেন হয়। ওখানকার পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হেড বা প্রধান যে ব্যক্তি, সে মামুনের বিষয়ে খোঁজখবর লাগাতে বলে। পুলিশ ভেরিফিকিশেন শেষ হবার আগেই সে একটি অদ্ভূত প্রস্তাব দিয়ে বসে মামুনকে, অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে। তার ভাই নাকি উপসচিব বা অতিরিক্ত সচিব, অরিজিনাল বাড়ি ঝালকাঠিতেই। সে উপসচিবের একটি মেয়ে আছে যে বরিশাল মেডিকেলে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। মেয়েটি সুন্দরী ও কুরআনের হাফেজ (মামুনও কুরআনের হাফেজ)। মেয়েটির সাথে মামুনের বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় ঐ লোক। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ছেলেটি তার ক্যারিয়ার শুরু করতে না করতেই তার বিয়ে নিয়ে টানাহেঁচড়া কেন? বাংলাদেশে সব ধরনের লোক নতুন কোনো অবিবাহিত ব্যক্তির সাথে পরিচিত হতে না হতেই কেন তাকে বিয়ে দিয়ে ফাঁসানোর ফন্দিফিকির করে? এটা কি ঠিক?




আগেরবার যা লিখেছিলাম

গত পরশুদিন অনেক দিন পর ছেলেটাকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হলাম। বাচ্চাকে নিয়ে ঘোরাঘুরি প্রায় ৬০% শেষ করে দীঘির পাড়ে বসে বাতাস খাচ্ছিলাম। (উল্লেখ করা যেতে পারে, আমি বর্তমানে গ্রামাঞ্চলে থাকি; শহুরে বিষাক্ত পরিবেশ বসবাসের অনুপযোগী বলে আমার ধারণা, বিশেষ করে ঢাকা শহর।) তো, এক পর্যায়ে, জমির দালাল সৈয়দ ভাই আমার পাশে এসে বসলেন, তিনি খালি গাঁয়ে ছিলেন; সম্ভবতঃ কিছুক্ষণ পরেই গোসল করবেন। আমি তাঁর গলার কাছাকাছি একটা চর্মরোগ দেখে তাকে সে ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি প্রথমে সেটার উত্তর দিয়ে পরে আমার শ্বশুরবাড়ির চৌদ্দগুষ্ঠির খোঁজ নেয়া শুরু করলেন। প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন আমার বড় শ্যালক মামুনের বিষয়ে। বললাম, সে দু’-তিন বছর আগে ডাক্তারি পাস করেছে। আগে খুলনা আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছিল; বর্তমানে ঢাকায় একটা প্রাইভেট মেডিকেলে পার্টটাইম জব করে, প্লাস, বাকিটা সময় নিজের চেম্বারে অবস্থান করে।

সৈয়দ আদতে সৈয়দ বংশের কোনো লোক নয়, তার বাবা-মা শখ করে ছোটবেলায় তার নাম রেখেছিল মোঃ সৈয়দ হোসেন। এমনিতে ছেলেবেলায় তার বাবা মারা যাওয়াতে তার মা অনেক কষ্ট করে তাদের চার ভাইকে বড় করেছেন, এমন কি সেটা করতে গিয়ে বাসায় বাসায় কাজের বুয়ার কাজও করতে হয়েছে ঐ মহিলাকে, যাকে আমি সম্মান করে ‘খালা’ বলে ডাকি। তবে, তারা আসলে এতটা সম্মান পাবার যোগ্য নয়, একেবারে ‘লো-ক্লাস’ ফ্যামিলি বলতে যা বুঝায়, তা-ই তারা। শুধু স্ট্যাটাসের দিক থেকে নিচু হলে সেটা উল্লেখ করতাম না; কর্মকাণ্ডের দিক থেকেও যে নিচু, সেটা পদে পদে টের পাওয়া যাচ্ছে।

যেমনঃ সৈয়দ বড় বড় দুইটা ছেলেমেয়ে থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি আরেকটি বিয়ে করেছে; অথবা বিয়ে করেছিল অনেক আগেই (একজনের ভাষ্যমতে, দশ বছর আগে), সেটা এখন প্রকাশ পেয়েছে। এটা নিয়ে ঝামেলায় সৈয়দকে নাকি এলাকার পোলাপানকে ৪০ হাজার টাকা ‘ঘুষ’ দিতে হয়েছে, ওদেরকে শান্ত করার জন্য। যাই হোক, সৈয়দের বড় সন্তান অর্থাৎ মেয়েটাকে সেদিন প্রথম দেখলাম, এরপর আরো কয়েকবার দেখেছি, সে নরসিংদীর আব্দুল কাদের মোল্লা সিটি কলেজে পড়ে। এমনিতে মেয়েটি খুব কালো, তবে মেধাবী যে, সেটা তার চোখমুখ দেখেই বলে দেয়া যায়।

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, এই মেয়েটি যখন সবেমাত্র মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল, তখন সৈয়দ আমার কাছে বিশেষ আব্দার ধরেছিল যে, তার মেয়েকে কম্পিউটার শেখাতে হবে। সেটা করতে আমার কোনো সমস্যা ছিল না, তবে আমি কেমনে জানি টের পেলাম, সৈয়দ তার মেয়ের সাথে আমাকে ‘ফিটিং’ করিয়ে দিতে চায়। যেমনঃ বাসায় যখন আমার বউ বা অন্য কেউ নেই, তখনও মেয়েটিকে আমার কাছে রেখে যেতে চায় সৈয়দ। আমি ভালো করেই জানি, সৈয়দ যে ধরনের লোক, তাতে তার মেয়ের সাথে একা বাসায় সময় কাটালে সে নির্ঘাৎ আমাকে তার মেয়ের সাথে ফাঁসিয়ে দিবে। যে শিয়ালের লেজ কাটা গেছে, সে চায় যাতে সকল শিয়ালের লেজ কাটা যাক। সৈয়দ নিজে যেহেতু দ্বিতীয় বিবাহ করেছে, তাই সে আমাকেও একই অবস্থায় দেখতে চাইবে – এইটা খুব স্বাভাবিক। এটাই হলো বেঙ্গলী সাইকোলজি বা মেন্টালিটি।

যাই হোক, পুরনো প্রসঙ্গ অর্থাৎ শালার কথায় ফিরে আসি। আমার ডাক্তার শ্যালক যেমন-তেমন কোনো ডাক্তার নয়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই সে বাংলাদেশের সেরা কয়েকজন ডাক্তারের কাতারে চলে আসবে, সে মেধা তার আছে। আমার মতো ‘সুপার লেভেলের বিদ্বান’ লোকও শ্যালককে নিজের চেয়ে বেশি বিদ্বান ও মেধাবী মনে করি; তাহলে বুঝতে হবে, সে কেমন! তার ব্রিলিয়ান্সের দু’একটা উদাহরণ দেই তাহলে।

২০১২ সালে কমনওয়েলথ দিবসে রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ নিজ হস্তে আমার শ্যালক মামুনের গায়ে বাংলাদেশের পতাকা জড়িয়ে দিয়েছেন; বলেছেন, ‘তোমার যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে আসবা, তোমার জন্য আমার বাড়ির তথা সংসদের দরজা সবসময় খোলা’। শ্যালকের কৃতিত্ত্ব হলো, সে বহির্বিশ্বের সংষ্কৃতি বা ‘ওভারসিস কালচার’ এর উপর উন্মুক্ত রচনা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করে কমনওয়েলথের ৩৫টা দেশের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়ে বাংলাদেশকে বিশেষ গৌরব এনে দিয়েছে।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, আমার ডাক্তার শ্যালক হলো সেই লেভেলের মেধাবী! (আর সে দেখতেও খারাপ নয়) এতো মেধাবী ছেলেটি নিশ্চয়ই সৈয়দের মতো জমির দালালের মেয়েকে বিয়ে করবে না! এ কথাটা বলার কারণ হলো, আমি একজন বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ‘সুপার এক্সপার্ট’। সৈয়দ কী কারণে আমার শ্যালকদের খোঁজ নিচ্ছে সেটা বুঝতে আমার আর বাকি নেই; সৈয়দ তো আমার বড় শ্যালকের বয়সের ব্যাপারেও খোঁজ নিয়েছিল।

পরে সে আমার ছোট শ্যালক মিরাজ-এর ব্যাপারে জানতে চায়। বললাম, সে ঢাকা ভার্সিটিতে ‘ল’-তে পড়ে। সৈয়দ যেহেতু অশিক্ষিত, তাই সে বুঝতে পারছিল না, এই সাবজেক্টে পড়ে ভবিষ্যতে কী হবে মিরাজ। আমি বললাম, অনেক কিছুই হতে পারে; যেমনঃ উকিল, ব্যারিস্টার, জজ, বিসিএস ক্যাডার, সেটা সময়ই বলে দিবে। বিষয়টির মাহাত্ম বুঝাতে অন্য একটি উদাহরণও দিলাম, বললাম, ‘জানেন নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু নিজে ‘ল’-এর স্টুডেন্ট ছিলেন? তিনি যে জায়গা থেকে ‘ল’ পড়েছেন (ঢাকা ভার্সিটি), সেখানে ‘ল’ পড়ছে আমার ছোট শ্যালক; বাংলাদেশে ‘ল’ পড়ার জন্য বেস্ট জায়গা বটে এটা’।

যাই হোক, আমার সাথে এসব আলাপচারিতা করতে করতে বেশ কিছু সময় কেটে গেল সৈয়দের। তখন তাকে পরিচিত একজন দূর হতে ডাক দিল এবং সে উক্ত ব্যক্তির সাথে আলাপের উছিলায় আমার পাশ হতে উঠে গেল। আর আমি কেবল মনে মনে ভাবি, ‘নিজের মেয়ে, বোন আর ভাগ্নি বিয়ে দেয়া ছাড়া বাঙালীরা আর কিছুই বোঝে না!’

বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করতে বাধ্য হলাম এই কারণে যে, এ সংক্রান্ত বেশ কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। যেমনঃ একবার যখন বাংলালিংকে আমার একটা টেকনিক্যাল জব হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তখন যে লিংকের মাধ্যমে অনুরোধ বা সুপারিশ পাঠিয়েছিলাম, সে লিংকের একজন যে কিনা আমার ইউনিভার্সিটিতে ডিপার্টমেন্ট-ওয়াইজ এক বছরের সিনিয়র বড় ভাইও বটে, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি বিয়ে করেছি কিনা’। বিয়ে আমি করেছি সাড়ে পচিঁশ বছর বয়সেই, আর ঘটনাটি হলো যখন আমার বয়স ত্রিশ। সত্যি বলার পর ঐ ভাইটি বোধ হয় নিরাশ হলেন, তিনি শেষ পর্যন্ত ঐ জবের ব্যাপারে আর কোনো হেল্প করলেন না আমাকে। হয়তো ভাবলেন, কোনো অবিবাহিত যুবককে ঐ চাকুরিটা দিয়ে নিজের নিকটাত্মীয়া কোনো মেয়ের বিয়ে দেবেন তার কাছে।

এছাড়া নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে কয়টি টিউশনি করিয়েছি, প্রায় সবকয়টিতেই অনুভব করেছি যে, ছাত্রী বা ছাত্রীর কোনো নিকটাত্মীয়া’র (যেমনঃ বড় বোন/খালা/ফুপু) সাথে বিয়েতে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্যই আমাকে রিক্রুট করা হয়েছে। বুয়েটের বেশিরভাগ ছেলেপুলের অভিজ্ঞতা এমনই। উদাহরণ হিসেবে রয়েছেঃ ২০০২ সালের শুরুতে নাখালপাড়ায় এক নোয়াখাইল্লা পরিবারে ‘চামেলী’ নামক এক মেয়ের টিউশনি, আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয়া সোনিয়া আর শশির পরিবারবৃন্দ। এই মেয়ে দুটি আমার চেয়ে যথাক্রমে ৯ ও ৭ বছরের ছোট ছিল। ড. মেহজুবে তাজরী মাহমুদ নামক এক ডাক্তার রয়েছে, তার অরিজিনাল বাড়ি ফেনী। তার পিতামাতাও চেয়েছিল তার সাথে আমার সেটিং করিয়ে দিতে। তবে তাদের সে অভিপ্রায় প্রথমে আমি বুঝিনি। যখন বুঝেছিলাম, তখন তাদের অতীত খারাপ আচরণের কথা স্মরণ করে সেদিকে আর পা বাড়াই নি। তাজরী আমার চেয়ে ছয় বছরের ছোট ছিল।

এছাড়া শামীম শাহেদ নামক যে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তার বউয়ের নাম হলো শাহরিন ইকরাম জাহান মুন্নী আর শ্যালিকার নাম তান্নি। শাহেদ ও মুন্নী তাদের তিন সন্তান নিয়ে বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী। এই মুন্নী আর তান্নিও ছিল আমার ছাত্রী। তারা বয়সে আমার চেয়ে যথাক্রমে ৭ ও ৮ বছরের ছোট ছিল। তাদের টিচার হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেয়ার পিছনেও ছিল একই কারণ। তারা বগুড়ার বাসিন্দা ছিল এবং ঐ সময় মুন্নী-তান্নির পিতা ট্রাফিক সার্জেন্ট হিসেবে বি.বাড়িয়ায় কর্মরত ছিলেন। মুন্নী-তান্নি বেশ সুন্দরী ছিল এবং তাদেরকে অপছন্দ করার মতো কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু আমাকে টিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়ার পেছনে তাদের অভিপ্রায় আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি। তারা পড়াশুনায় খুব ফাঁকিবাজি করতো। বিশেষ করে, তারা যখন বুঝতে পারলো যে, আমি তাদেরকে কেবল পড়ানোর ব্যাপারেই আগ্রহী, তখন তারা আমার সাথে বিশাল লুকোচুরি শুরু করলো। মানে, বড় বোন যেদিন আমার কাছে পড়বে, ছোট বোন সেদিন পড়বে না, সে নাকি অসুস্থ! এই নাটক পালাক্রমে চলতে লাগলো প্রায় প্রতিদিনই। মতিঝিল আইডিয়ালের মতো স্কুলে পড়া সত্ত্বেও তাদের এহেন মানসিকতা আমার সহ্য হয়নি। তাই এক পর্যায়ে সকল প্রকার ‘ভালো লাগা’ বিসর্জন দিয়ে তাদেরকে পরিত্যাগ করে চলে আসি আমি।



Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.