দুনিয়াজুড়ে কেবল কনফরমিস্ট

কনফরমিস্ট বলতে এমন লোক বুঝায়, যারা মাত্রাতিরিক্ত মানিয়ে চলেন। চলার পথে ও সমাজে বিভিন্ন প্রকার লোকের সাথে মিশতে হয় আমাদের। তখন মতবিনিময় ও মতামত প্রদানের মতো বিষয় থাকে। আপনার সহকর্মী বা প্রতিবেশী যেমন আপনার সব মতামত মেনে নিবেন না, তেমনি আপনিও তাদের সব মতামত মেনে নিতে বাধ্য নন। কোনটা মেনে নিবেন আর কোনটা নিবেন না, সেটা আপনার বিবেক ও ন্যায়-অন্যায় বোধের উপর নির্ভর করে। কিন্তু এ সমস্ত বিষয়ে যেসব ব্যক্তি তাদের বিবেককে মাত্রাতিরিক্তভাবে দমিয়ে রাখে, অর্থাৎ ন্যায়- অন্যায়ের ধার ধারে না, তারা হলো কনফরমিস্ট।

এরা আসলে সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়ার আশংকায় থাকে। অথবা সাময়িকভাবে কিছুদিনের জন্য কনফরমিস্ট হয় নিজের কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। বাংলাদেশের মতো দেশে অনেকেই তাদের বোন বা মেয়ে বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কয়েক বছরের জন্য কনফরমিস্ট রূপ ধারণ করে। ওই মেয়েটির বিয়ে হয়ে যাওয়া মাত্রই তারা আবার স্বরূপ ধারণ করে। এসময় তাদের অনেকেই ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলে, অর্থাৎ তাদের ঠেকা সেরে গেছে।

বাংলাদেশের লোকজন যে নিজেকে ধার্মিক ও সামাজিক প্রমাণ করতে চায়, কখনো ভেবে দেখেছেন কি, এর পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে?  বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামাজিকীকরণের উদ্দেশ্য হলো – রেফারেন্স বা সুপারিশ এর মাধ্যমে চাকুরি জোগাড় করা, প্রয়োজনের সময় টাকা ধার নেয়া, নিজের মেয়ে বা বোন বিয়ে দেয়া, সামাজিকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়া, প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তার করা, নিজের পরিবার যাতে একঘরে না হয়, বিপদে লোকজন যাতে সাহায্যে এগিয়ে আসে – এইসব আরকি। এর মধ্যে কয়েকটি গ্রহণযোগ্য, কিন্তু বেশিরভাগই হলো ছোটলোকি চিন্তাভাবনা।

যদিও শিরোনামে বলেছি, দুনিয়াজুড়ে কেবল কনফরমিস্ট। আসলে কনফরমিস্ট বেশি হলো বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে। বিশেষ করে যেসব দেশে অন্যায়-অবিচার বেশি চলে, শক্তিমানেরা দুর্বলদের নির্মমভাবে অত্যাচার করে। আবার দেখা গেছে, যেসব দেশের মানুষ বেশি ধর্মান্ধ ও গোঁড়া সেসব দেশেই এসব অত্যাচার বেশি চলে। কারণ সেসব দেশে শক্তিমানেরা ধর্মের দোহাই দিয়ে বা হাইকোর্ট দেখিয়ে দুর্বলদেরকে ফাঁপরে রাখে। তাই উন্নত দেশ গঠন করতে হলে সর্বপ্রথমে ধর্মকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে।

বাংলাদেশে কনফরমিস্ট বেশি হয় গ্রামের মানুষ, অর্থাৎ যারা গ্রামে বড় হয়। এরা তীব্র মাত্রায় মুনাফিক টাইপের হয়। এদের মনে এক কথা আর মুখে আরেক কথা। এর কারণও আছে অবশ্য। গ্রামের লোকজন বাড়াবাড়ি রকমের চালবাজ ও কুটনা টাইপের। এদেরকে কুটিল বলা যেতে পারে, এরা কে কাকে বাঁশ দিবে সবসময় সে ধান্ধায় থাকে। আমি ঢাকা শহরে বড় হয়েছি, কিন্তু এখন গ্রামে থাকি (রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ)। তাই এখানে যা বলছি তা অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। অনেকে বলে, গ্রামের লোকজন নাকি সহজ-সরল। এটা পুরা একটা ফাও কথা। গ্রামের লোকজনের মাথায় থাকে ভিলেজ পলেটিক্স। তাই এরা ছাত্রজীবনে যত মেধাবী হোক না কেন, পরবর্তীতে কর্মজীবনে ইনোভেটিভ কিছু করতে পারে না। দেশে বর্তমানে যেসব বড় বড় কাজ হচ্ছে, সেগুলো করছে শহরে মানুষ হওয়া লোকজন। নটর ডেমে আমার ক্লাসমেট আসিফ মাহমুদ সেরকম একজন ব্যক্তি। সে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র ছিল, অর্থাৎ সে শহরে বড় হয়েছে। 

আবার এমনও হতে পারে, ছাত্র বা ছাত্রীর পরিবার হয়তো মফস্বল শহরে থাকে, চাকুরির সুবাদে তারা এক জায়গায় খুব বেশিদিন থাকতে পারে না। এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা পুরোপুরি শহরে না থাকলেও ভিলেজ পলেটিক্স এর প্রভাব থেকে মুক্ত। তাই এরা টেরিটোরিয়াল মানসিকতার হয় না।

ভিলেজ পলেটিক্স হলো, কোনো গ্রামের এক স্থায়ী বাসিন্দা অপর এক স্থায়ী বাসিন্দা বা পরিবারকে তাদের ভিটেমাটি ছাড়া (উচ্ছেদ) করতে চায়, যদি তাকে মেনে না চলে বা নতিস্বীকার না করে। এটা আসলে একটা ইঁদুর দোড়, এ খেলা চলতে থাকে সারাজীবনই, কিন্তু জয়ী হওয়া বা তৃপ্তি পাওয়া লোকের সংখ্যা হাতে গোণা।           

মেইন কথা হলো, এসব কনফরমিস্ট গিরি বাদ দিতে হবে। আপনার বোনকে পড়াশুনা শিখিয়ে মানুষ করুন, তার ভালো বিয়ে এমনিতেই হবে। আর বিয়ে হতে দেরি হলে সমস্যাটা কী? সে ক্যারিয়ার গড়তে থাকবে, পরে নিজেই একজন যোগ্য পাত্রকে জোগাড় করে নিবে।       

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


CAPTCHA Image
Reload Image

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.