তুনে আখের তেরা আসলিয়াত দেখাঈ দী (বর্ণচোরাদের গল্প)

উপর্যুক্ত হিন্দী বাক্যটির মানে হলো – ‘তুই তাহলে শেষ পর্যন্ত তোর আসল চেহারা দেখিয়ে দিলি’। এ আর্টিক্যালটির আরেকটি বিকল্প শিরোনাম হতে পারতো, ‘বাঙালী কাজের বেলায় কাজি, আর কাজ ফুরালে পাজি’। যার আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে এই আর্টিক্যালটি লিখছি, তার নাম হলো আজিজ মিয়া, সে রূপগঞ্জে আমার একজন নিকটতম প্রতিবেশী।

আগে আমার বাড়ির ধারেকাছে বৈদ্যুতিক খুঁটি ছিল না, তাই তাদের বাড়ি থেকে সাইড কানেকশন নিয়েছিলাম। কিছুদিন আগে (মার্চে) এখানে খুঁটি এসেছে। তাই তাত্ত্বিকভাবে বৈদ্যুতিক মিটার নিতে আর কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাস্তবিকে সমস্যা হলো, করোনা। করোনার কারণে বর্তমানে এ এলাকায় বিদ্যুতের নতুন সংযোগ (মিটার) দেয়া হচ্ছে না – এমনটাই জানতে পেরেছি সেদিন এখানকার বিদ্যুৎ অফিসে গিয়ে।

বর্তমানে প্রায় ৬০ বছর বয়ষ্ক আজিজ মিয়া কয়েক বছর আগে দেখতে সম্ভবত এমনই ছিল

বিদ্যুতের লাইনের ক্ষেত্রে আজিজ মিয়ারাও সংকটে ছিল। তারা অন্যের বাড়িতে মিটার লাগিয়ে সেটা ব্যবহার করতো, সেখান থেকে আমি সাইড কানেকশন নিয়েছি। কানেকশন দিতে বাধ্য হয়েছিল কারণ আজিজের নাতনী রূপাকে পড়াতাম ঐ সময়। সে নিউ টেনের স্টুডেন্ট ছিল। কানেকশন নেয়ার দুই-তিন মাস পরে নতুন জবে জয়েন করায় এবং অফিস ঢাকায় অবস্থিত হওয়ায় সে টিউশনি কন্টিনিউ করা সম্ভব হয় নি আমার পক্ষে।

তখন কিছুদিন বিচ্ছিন্নভাবে তাঁকে ফ্রি ফ্রি পড়িয়েছিলাম আজিজ মিয়া আর তার বউয়ের (রূপার দাদী) রিকোয়েস্টে। তারা অবশ্য ঠিক ফ্রি ফ্রি পড়াতে বলে নি। বলেছিল, ‘ও তো অমুক ম্যাডামের কোচিং-এ ভর্তি হয়েছে। তুমি মাঝে মাঝে এসে ওকে একটু পড়া দেখিয়ে দিও।’ কিন্তু এর বিনিময়ে আমাকে কিছু দিবে কিনা এ বিষয়ে মুখ খুলছিল না। অর্থাৎ তারা ফাও খাওয়ার আশায় বসে ছিল। তারা অরিজিনালি বরিশালের ভোলার বাসিন্দা। আজিজ মিয়া কামলাগিরি করে, অর্থাৎ অন্যের জমিতে টাকার বিনিময়ে খেটে দেয়। এছাড়া বিভিন্ন লোকের কাছে জমি লিজ নিয়ে সেগুলো চাষবাস করে সেটার একটা অংশ নেয়। এভাবেই সে জীবিকা নির্বাহ করে। আগে সে জেলে (fisherman) ছিল এবং পরবর্তীতে ঢাকায় (রিকশা) ভ্যান চালাতো। অথচ সে সুযোগ পেয়ে আমার মতো শিক্ষিত লোকের সাথে যে আচরণ করলো, তাতে বলাই চলে – ‘তুনে আখের তেরা আসলিয়াত দেখাঈ দী’।

তার নাতনী রূপাকে এসএসসি পরীক্ষার সময় চারদিন এবং এর ইমেডিয়েট আগে কমপক্ষে চারদিন ফ্রি পড়িয়েছি। এছাড়া গত বছর টিউশনিটা অফিসিয়ালি ছেড়ে দেয়ার পর তাকে ৪/৫ দিন ফ্রি পড়িয়েছিলাম (তারা টাকার নাম নেয় না, সুতরাং ফ্রি নয়তো কী?)।

এখন সেই মেয়ে জিপিএ ৫ পেয়েছে (সমাজ ও সাধারণ গণিতে এ+ পায় নি), তাই আজিজ মিয়ার ঠেকা সেরে গেছে। সে কোত্থেকে যেন নিজস্ব মিটার আনবে এইবার (দালাল ধরে ‘চোরাপানি’ করে), নতুন কানেকশনে আমাকে রাখতে চায় না। এছাড়া বিল শেয়ারিং নিয়ে কয়েক মাস ধরে জোচ্চুরি করছে। যেমনঃ জানুয়ারী মাসে মোট বিল এসেছিল ৬০৯ টাকা, এর মধ্যে কৌশলে আমার কাছ থেকে নিয়েছে ৫০০ টাকা। আমি সরল মনে তাকে সেটা দিয়েছি, ভেবেছি এ কয়টা টাকা নিয়ে কি আর ভেজাল করবে?!

সে থেকে আমি বিল শেয়ারিং এর বিষয়ে সাবধান হয়ে গেছি। জেনারেল চুক্তি হলো এই রকম – টোটাল বিলের আমি দেব ৬০% আর তারা দেবে বাকিটা (আমি অবশ্য এবার বাদে আগের বাকি সববার ৬০% বা তার কিছুটা বেশি দিয়েছি)। এর পেছনে যুক্তি তিনটিঃ (১) আমার ঘরে বিদ্যুৎ এসেছে বেশি লম্বা লাইনের মাধ্যমে (২) তাদের মতে, আমার ঘরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বেশি এবং সেগুলো আমরা বেশি ব্যবহার করি (৩) ইউনিট বেশি আসলে বিলের রেট বেড়ে যায়।

গত মাসে আমি পরিবারসহ ঢাকা ছিলাম। কেবল ফ্রিজ চলছিল (নতুন কোনো বস্তু ঢুকানো হয় নি) এবং একটি ৫ ওয়াটের বাল্ব সার্বক্ষণিক জ্বলা ছিল। এ দু’য়ের সম্মিলিত মাসিক বিল কোনোদিন ২৫০ এর বেশি হবে না; আর লম্বা তার, অধিক রেট বিবেচনা করলেও আমার ন্যায্য শেয়ার হবে খুব বেশি হলে ৪০০ টাকা। তারা হয়তো এ সময়টায় আমাদের অনুপস্থিতিতে উল্টাপাল্টা (বেশি করে) ব্যবহার করেছে, তাই সম্মিলিত বিল এসেছে ১১২০ টাকা।

আমার দাবী ছিল, এবার ৫০% দেব; কিন্তু আজিজ মিয়া আর তার বউ এটা মেনে নিতে নারাজ। তারা তাদের বেহিসেবী ঘ্যানঘ্যান চালিয়েই যাচ্ছিল, ‘তুমি থাকো নাই তো কী হইছে, তোমার ফ্রিজ তো চলছে আর লাইট জ্বালানো ছিল পুরা এক মাস’। তারা তো এটা চিন্তা করে দেখে নাই যে, ফ্রিজে নতুন কিছু ঢুকানো না হলে যৎসামান্য বিল আসে। আর ৫ ওয়াটের বাল্ব তো তারা জন্মেও দেখে নাই। তারা এলইডি’র নামে যা ইউজ করে সেগুলো ২০/৩০ ওয়াটের হওয়ার কথা থাকলেও লোকাল মাল হওয়ায় আসলে ১০০ ওয়াটেরও বেশি। একটি গ্যারান্টেড ইমার্জেন্সি (রিচার্জেবল) এলইডি লাইট বাল্ব কতটা কোয়ালিটি প্রোডাক্ট হলে সেটা তিন বছর পার হবার পরও টানা সার্ভিস দিতে থাকে, সেটা তো তারা বুঝবে না।

৫০% নিতে রাজি না হওয়ায় বিল দিতে কিছুটা দেরি করেছি, তাদেরকে একটু ঘুরিয়েছি, হয়রান করেছি। যার ফলে তারা এখন যারপরনাই বিরক্ত, আমাকে সরাসরি বলে দিল, নতুন মিটার আসলে তারা আর কানেকশন দিবে না আমাকে। ব্যাপারটা এই না যে, আমি নিজস্ব মিটারের জন্য চেষ্টা করছি না। বিদ্যুৎ অফিস থেকে বলেছে, জুলাইয়ের ১৫ তারিখের পর যোগাযোগ করতে, সেটা আমি করবো। তাহলে এই দুই-এক মাস আমার সাথে বিদ্যুৎ শেয়ার করলে আজিজ মিয়াদের কী এমন সমস্যা, সেটা আমি বুঝতে পারছি না।

আসলে তাদের নাতনী যেহেতু এসএসসি পাস করে গেছে , তাও আবার (হাসিনার দয়ায়) এ+ সহকারে, সুতরাং তাদেরকে এখন আর পায় কে? যেহেতু করোনার কারণে কলেজে ভর্তি কার্যক্রম ও ক্লাস শুরু স্থগিত, তাই তারা আমাকে এখন আর গুণায় ধরছে না। তাই তারা এমন চরম সেলফিশ আচরণ করছে। আমিও কম চালবাজ নই, তাদেরকে বলে দিলাম, ‘আচ্ছা, খুইলা নিমু। আমার তার (শিপের দামী মোটা তার), সার্কিট ব্রেকার দিয়ে দিবেন আর রূপার টিউশনির এক মাসের টাকা দিয়ে দিবেন।’

টাকার কথাটা শুনে আজিজের চান্দি গরম হয়ে গেল; তারা কিছুতেই হিসেব মিলাতে পারছে না, এখানে একমাস হলো কীভাবে। হিসেবটা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। আজিজ এখন খেপে গিয়ে বললো, ‘কানেকশন আমি এখনই খুইলা দিমু।’ আমিও তেজ দেখিয়ে বললাম, ‘দ্যান’। আসলে সে খুলে দিলেও আশেপাশে আরো বাড়িঘর আছে, যেখান থেকে সাইড কানেকশন নেয়া যাবে। এবার আজিজ অশ্রাব্য, অশ্লীল কথাবার্তা শুরু করলো, যেমনঃ ‘যারা পু*কি মারতে পারে, …’। অর্থাৎ তার দাবী মোতাবেক, সে সৎ মানুষ। এখন যদি তাকে বলতে যাই যে, জানুয়ারী মাসে সে কৌশলে কত টাকা চুরি করেছে, তাহলে তো আরো খেপে যাবে।

এসব ঘটনা তিন-চারদিন আগের। লাইন এখনো কেটে দেয় নি। আসলে তাদের নতুন মিটারই আসে নি এখনও। তবে সে ইদানিং আমাকে দেখলে থুতু ফেলছে, দূর থেকে, গা ঘেঁষে নয়। তাই তাকে ঠিক ‘ছোটলোক’ উপাধি দেয়া যাচ্ছে না আমার দেয়া নিম্নোক্ত থিওরি অনুসারে।

ছোটলোকের বৈশিষ্ট্য কী কী?

তবে তারা যে চরম সেলফিশ আর ধান্ধাবাজ, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বেশ কয়েকটি উদাহরণ নিম্নরূপঃ

(১) রূপা পাশ করেছে, কিন্তু কাউকেও মিষ্টিমুখ করায় নি তারা। বাড়ির ধারেকাছে অন্য কাউকে না হলেও আমাকে অন্ততঃ সেটা করানো উচিত ছিল তাদের।

(২) রূপা জিপিএ ৫ পেলেও কোন কোন সাবজেক্টে এ+ মিস করেছে, সেটা আমি জানতে পারি নি, দীর্ঘ এক/দেড় মাস। বস্তুত সে রেজাল্টের পর আমাকে ফোনই দেয় নি। আমার বউ তার দাদীর (আজিজের বউ) কাছে ফোন করে তার পাশের বিষয়টা জেনেছে নিজ তাগিদে, প্রতিবেশী হিসেবে। তখন আমরা ঢাকায় ছিলাম, আর রূপাও ঢাকায় কোনো এক আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াচ্ছিল।

(৩) রূপার ছোট বোনের আকিকা উপলক্ষ্যে তারা আমাদেরকে দাওয়াত দেয় নি (তখন আমি রূপাকে পড়াতাম), দাওয়াত দেয় নি রূপার দাদীর আপন ছোট বোনের পরিবারকেও, আর রূপার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ক্লাসমেট তাবিতার পরিবারকেও। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় মিঠু মোল্লাদের পরিবারকে দাওয়াত দিয়েছে। তারা বহু দূরে বাস করে, প্লাস আজিজদের বাসাবাড়ির অবস্থা একেবারে ফকিন্নি টাইপের, তাই তারা দাওয়াতে আসে নি। অর্থাৎ আজিজেরা বুঝতে পেরেছিল যে, মিঠু মোল্লারা আসবে না, তাই তাদেরকে দাওয়াত দিয়েছে।

এরকম বহু খাইষ্ঠামির উদাহরণ আছে তাদের। অথচ আমি এখানে বাড়ি করার পর তাদের সাথে যেচে মিশতে যাই নি, তারাই আমাদের সাথে মিশতে এসেছিল। তাই সবার প্রতি পরামর্শ হলো, বৃহত্তর বরিশাল বিভাগের লোকজন যদি আপনার সাথে যেচে মিশতে আসে, তাহলে তাদেরকে পাত্তা দিবেন না। আজিজের ভাষায়, ‘তারা শুধু আপনাকে পু*কিই মারবে!’

আর শেখ হাসিনা ও তার সরকারের লোকদের বলতে চাই, ‘তোমরা মুজিব বর্ষ নিয়ে এতো ফালাফালি না করে করোনার প্রস্তুতি নিয়ে রাখলে এই আকামটা বাঁধাতে না, আর দেশও এতটা অচল হতো না। তোমাদের কারণেই আমার ঘরে এখনও বৈদ্যুতিক মিটার আসে নি।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.