গ্রামে নীরবে ছড়াচ্ছে করোনাভাইরাস

গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অতিমাত্রায় জ্বরসহ করোনাভাইরাসের উপসর্গ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে নমুনা পরীক্ষাসহ চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। ফলে তাদের সবাই আক্রান্ত কিনা তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তবে যারা উপজেলায় এসে পরীক্ষা করাচ্ছেন তাদের অনেকেই আক্রান্ত বলে শনাক্ত হচ্ছেন। এছাড়া অন্যদের লক্ষণ দেখে চিকিৎসকরা প্রায় নিশ্চিত এদের অনেকেই প্রাণঘাতী এ ভাইরাসে আক্রান্ত।

মানুষ কয়েক দফায় ঢাকা থেকে গ্রামে গিয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে অবাধ চলাফেরা করে ভাইরাসটি সেখানে রেখে এসেছেন। তা থেকেই অসচেতন গ্রামবাসীর মধ্যে করোনা নীরবে সংক্রমণ ঘটিয়ে চলেছে বলে মন্তব্য করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, সংক্রমণ শুরুর পর কয়েক দফায় মানুষ দলে দলে গ্রামে ফিরেছেন। মহামারীর মধ্যে ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের বাড়ি যাওয়া উৎসবে পরিণত হয়েছিল। বাড়ি ফেরাদের অনেকেই সুপ্ত অবস্থায় করোনাভাইরাস শরীরে বহন করে নিয়ে গেছেন। সেখানে হাট-বাজার, আত্মীয়র বাড়িতে ঘুরেছেন অবাধে। এসব স্থানে হাঁচি-কাশি, কথা বলার মাধ্যমে সুপ্ত ভাইরাসটি রেখে এসেছেন। কাজেই ছুটির সময় গ্রামের অবস্থা খুব বেশি বোঝা যায়নি। ছুটির সাত দিন পার হওয়ার পর থেকেই সংক্রমণের কিছু লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখন ধীরে ধীরে এর প্রসার ঘটছে বলে জানা গেছে। ফলে বিভিন্ন গ্রামে প্রায় প্রতিদিনই করোনার উপসর্গ নিয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে। কিন্তু ওই পরিবারের অন্য কারও নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে না বা তাদের আইসোলেশনেও রাখা হচ্ছে না। ফলে এদের শরীর থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে করোনা।

দলে দলে মানুষের গ্রামে যাওয়ার এই প্রবণতা দেশকে বড় ধরনের হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গ্রামগুলো এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। গ্রামে ব্যাপক হারে করোনা উপসর্গের রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ছুটির শুরুতে ও ঈদের সময় শহরের মানুষ সুপ্ত অবস্থায় করোনাভাইরাস নিয়ে গ্রামে গিয়ে ছড়িয়ে দিয়ে এসেছে।

তিনি বলেন, যারা বাড়ি গেছে, তারা কেউই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেনি। প্রান্তিক পর্যায়ে গিয়ে মানুষকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য নিয়মিত পাহারা দেয়ারও সুযোগ নেই। গ্রামের মানুষজন এখনও হাটবাজারে, দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছে। শহর থেকে এই মানুষগুলো গ্রামে গিয়ে তার নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি পুরো গ্রামকে হুমকির মুখে ফেলেছে। এতে সংক্রমণের হার বেড়েছে, মৃত্যুর হার বেড়েছে। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সরকার কি করেছে সেটি বিবেচনায় না নিয়ে প্রত্যেককে নিজের জীবন নিজেকে বাঁচাতে হবে। লকডাউন নিজের কাছে। শহরে বা গ্রামে যে যেখানেই থাকুন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদের পর থেকে দেশের বেশির ভাগ গ্রামে জ্বরের রোগী বেড়েছে। শুক্রবার ভোলার চরফ্যাশন থেকে মিজানুর রহমান জানান, তার পরিবারের দু’জন প্রায় সাত দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। কিন্তু সেখানে কোনো চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না, পরীক্ষার ব্যবস্থা তো একেবারেই নেই। একই তথ্য জানান পাবনার সুজানগরের অনুপ, ফেনীর হান্নান। পাবনার অনুপ জানান, তার পরিবারের অন্তত তিনজন জ্বরসহ কাশির উপসর্গ নিয়ে ভুগছেন। কিন্তু সেখানে পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কুমিল্লার একজন জানান, তার ও পাশের গ্রামে দু’জন দু’দিনে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন। কিন্তু দুই পরিবারের কাউকে আইসোলেশনে রাখা হয়নি বা তাদের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়নি।

জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত আট সদস্যের কমিটি বিষয়টিকে আশঙ্কাজনক আখ্যায়িত করেছে। তাদের অভিমত, বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের পিকটাইম চলছে। এ সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। হাজার হাজার মানুষ যেভাবে ঢাকা থেকে গাদাগাদি করে গ্রামে ছুটছেন, তাতে আক্রান্ত ও মৃত্যু আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

সূত্র জানায়, ঈদের আগের ও পরের শনাক্তের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় যে, রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ঈদের আগে ২৩ মে ঢাকার বাইরে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ৩৭০৭ জন, ২৪ মে ছিল ৩৬০০ জন, ২৫ মে ছিল ৩৩৯২ জন। একইভাবে ঈদের পর ৩১ মে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যা ছিল ৩৭৭৭ জন, ১ জুন ৩৮৫৯ জন, ২ জুন ৩৯৮৫ জন, ৩ জুন ৪৪৯৩ জন, ৪ জুন ৪০৯০ জন এবং ৫ জুন এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৯৩৯ জনে। এটা থেকেই বোঝা যায় প্রান্ত পর্যায়ে ভাইরাসটি তার সুপ্তিকাল অতিক্রম করে ধীরে ধীরে সংক্রমণ ঘটাতে শুরু করেছে। তাই প্রতিদিনই পরীক্ষার পাশাপাশি বাড়ছে শনাক্তের সংখ্যা।

রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট-আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এসএম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, যেহেতু ঈদে সবাই বাড়ি গেছে, তাই গ্রামে ভাইরাস ছড়ানো খুবই স্বাভাবিক। তবে সেখানে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। যাতে লক্ষণ রয়েছে এমন সবাইকে পরীক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়।

জনস্বাস্থ্যবিদদের সমন্বয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত আট সদস্যের কমিটির অন্যতম এক সদস্য যুগান্তরকে বলেন, একাধিকবার রাজধানী ছেড়ে যাওয়া ও আসার কারণে দেশের ৬৪ জেলায় ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে। যার ফল ইতোমধ্যে আমরা পেতে শুরু করেছি। প্রতিদিনই শনাক্ত ও মৃত্যুর হার বাড়ছে। সামগ্রিক পর্যবেক্ষণে বলা যায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান যুগান্তরকে বলেন, ঈদে ও সাধারণ ছুটিতে মানুষ গ্রামে যাওয়ায় সেখানে করোনা ঝুঁকি বেড়েছে। তবে যারা নিজেদের সন্দেহজনক মনে করছেন তাদের অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। উপজেলা হাসপাতালে নমুনা শনাক্তের ব্যবস্থা রয়েছে। বেশি অসুস্থ মনে হলে ঝুঁকি না নিয়ে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ভাইরাসবিদদের মতে, ভাইরাসটির বিস্তার হ্রাসের মূল উপায় কার্যকর লকডাউন ও নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা। আমরা একটিও করতে পারিনি। প্রথমে সংক্রমণ ছিল ঢাকা ও মাদারীপুরে। এরপর নারায়ণগঞ্জ যুক্ত হয়। মানুষকে ঘরে রাখার উদ্দেশ্যে ২৬ মার্চ থেকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ছুটি ঘোষণার পর মানুষ দল বেঁধে ঢাকা থেকে গ্রামে চলে যায়। এরপরই কিন্তু ঢাকার বাইরে সংক্রমণ শুরু হয়। একে একে ৬৪ জেলাতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এখন প্রত্যন্ত গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে আক্রান্ত ও সংক্রমণের হার বেড়েছে।

সূত্রঃ দৈনিক যুগান্তর, ৭ জুন

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.