কেন ঢাকা ছাড়ছে মানুষ?

দীর্ঘদিন বেকার। আয়-রোজগার বন্ধ। করোনা তাদের জীবনকে এলোমেলো করে দিয়েছে। ঘরে খাবার নেই। বাসা ভাড়া দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছে আগেই। এ অবস্থায় তাদের সামনে গাঢ় অন্ধকার। ভাগ্য বদলাতে ঢাকায় এসে এখন দুর্ভাগ্য নিয়ে ফিরতে হচ্ছে গ্রামে। মাস শেষে বাসা ভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট-ডিশ বিলসহ নানা খরচে দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে বহু মানুষের জীবন।

শহরের ব্যয়ভার বহন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন এসব কর্মহীন মানুষ। প্রতিদিনই দেখা যায়, মালপত্র ট্রাকভর্তি করে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। কেউ কেউ মালপত্র রেখেই যাচ্ছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন, বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্ট শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।

এমনই একজন রাজীব হাসান। স্বপ্নের ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন।  পিকআপে মালপত্র তুলছিলেন তিনি। মালপত্র বলতে একটি খাট, ছোট একটা আলমারি, টেবিল, ফ্রিজ, টিভি, দুটো চেয়ার আর কয়েকটা বস্তা। মিরপুর মোল্লাপাড়া বস্তিতে থাকতেন তিনি। একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন। তার স্ত্রীর কোলে ২ বছরের বাচ্চা। তিনিও একটি কম্পিউটারের দোকানের লোকদের দুপুরের খাবার রান্না করে সরবরাহ করতেন। কেন ঢাকা ছাড়া?

রাজীব জানান, করোনার ছুটিতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রেস্টুরেন্টটি। পরে চালু হলেও বেচা-বিক্রি নেই। তাই মালিক লোক কমিয়ে দেন। এ তালিকায় তিনিও পড়েছেন। বলেন, কাজ করতেন ৬ জন। এখন কাজ করেন ৩ জন। তার স্ত্রী রান্না করা খাবার সরবরাহ করতেন একটি দোকানে। খোলার পর সেখানেও এখন আর খাবার নেয় না। এ অবস্থায় ঘরে খাবার নেই। বাড়ি ভাড়া দিয়ে থাকাও সম্ভব হচ্ছে না তাদের। তাই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। তাদের বাড়ি সিরাজগঞ্জে।

রাজীব বলেন, প্রায় ৩ মাস ভাড়া দিতে পারিনি। ১৫ হাজার টাকা বাড়িওয়ালা পান। বাড়িওয়ালা খুব ভালো। কোনো দিন কিছু বলেননি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন থাকা যায়? আয় নেই। খাবো কি তাও জানি না। উপায় না পেয়ে বাড়ি থেকে ধার করে ১০ হাজার টাকা এনে বাড়িওয়ালাকে দিয়েছি। বাড়িওয়ালা ৫ হাজার টাকা পরে দিতে বলেছে। পিকআপ ভাড়া সাড়ে ৬ হাজার টাকা। ধার করে এই টাকাও দিতে হয়েছে। বাড়িতে যাচ্ছি। বাড়িতে কী করবো সেটাও জানি না। তার পরও ভরসা সেখানে স্বজনরা আছে। অন্তত না খেয়ে থাকতে হবে না।

রাজীবের মতো অনেকেই রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছেন। গাইবান্ধার ঘোড়াঘাটে বাড়ি মইনুল হাসানের। তিনিও প্রায় ১৫ দিন আগে ঢাকা ছেড়েছেন। তিনি কাজ করতেন একটি ড্রাই ওয়াশিংয়ের দোকানে। মইনুল বলেন, দোকানে কাজ করতাম ৮ জন। ২ জন চাকরি হারাইছি। আমার বউ কাজ করতো মানুষের বাসায়। এখন কোনো কাজ নেই। একসঙ্গে কর্মহীন হয়ে পড়েছি দু’জনই। আমাদের ৩ ছেলেমেয়ে। মানুষের দেয়া ত্রাণ দিয়ে খেয়ে না খেয়ে এতদিন পার করেছি। কোনো কাজ জোটেনি। কয়েকদিন রিকশা চালাইছি। কিন্তু রিকশা চালানোর মতো শক্তি আমার নেই। এদিকে বাড়িওয়ালার চাপ। বাড়ি ভাড়া না দিতে পারলে গালাগালি হুমকি-ধমকি দেয় বাড়িওয়ালা। উপায় না দেখে বাড়ির একটা গরু বিক্রি করে বাড়ি ভাড়া দেই। এর পরই ঢাকা ছেড়ে বাড়ি চলে আসি।

রাজধানীর শুক্রাবাদে ছোট একটি স্থানে ১২টি ঘর করে ভাড়া দেন শিকদার আলী। প্রতিটি ঘরের ভাড়া ৩ হাজার টাকা করে। তিনি বলেন, আমার ১২টা ঘর কোনো সময় ফাঁকা থাকে না। মানুষ ভাড়া নিতে চায় আমি দিতে পারি না। এখন আমার ৪টা ঘর খালি। সামনের মাসে আরো একজন ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছেন। ভাড়া দিচ্ছি ২ হাজার টাকায়। তারপরও কেউ ভাড়া নিচ্ছে না।  

কথা হয় মিজানুর রহমান নামের একজন পিকআপ চালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভাড়া পাচ্ছি। সবাই ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আমার মতো সব পিকআপ চালকই বাড়ি ছাড়ার ভাড়া পাচ্ছে।

শুধু নিম্নআয়ের মানুষই নয়, ঢাকা ছাড়ছেন মধ্যবিত্ত মানুষজনও। একটি কোম্পানিতে কাজ করেন আসিফ তালুকদার। বাবা মারা গেছেন। মা ও স্ত্রীসহ থাকতেন মোহাম্মদপুরে। বলেন, ২ মাসের বেতন দেয়নি অফিস। বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। মা আর স্ত্রীকে রংপুরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বলেন, মাসে ১১ হাজার টাকা ভাড়া দেয়া আমার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার। আমি একটা মেসে উঠেছি।

কথা হয় মিরপুর ৬০ ফিট এলাকার বাড়িওয়ালা আব্দুল বাতেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার ৬ তলা বাড়িতে ১১টি ফ্ল্যাট। যার ১০টি ভাড়া দেই। কিন্তু করোনাকালে ফাঁকা হয়েছে ৩টি। ভাড়া ১০ হাজার টাকা ছিল এখন ৮ হাজার টাকায় ভাড়া দিতে চাইলেও মিলছে না ভাড়াটিয়া।

ওদিকে রাজধানীর মেসগুলোও ফাঁকা হতে শুরু করেছে। করোনার ছোবলে বন্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তাই মেসগুলো ছেড়ে দিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। শুক্রাবাদ এলাকার একটি বাড়ির মালিক মিলন চৌধুরী। তিনি বলেন, আমার বাড়ি ৪ তলা। এর ৭টি ফ্ল্যাটই মেস করা। এরই মধ্যে ৪টি ফ্ল্যাট ফাঁকা হয়ে গেছে। অন্য মেসগুলোতে অর্ধেক করে দিয়েছি ভাড়া। তারপরও কেউ থাকতে রাজি নয়। একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া বাড়ি গেছেন করোনার শুরুতেই। ক’দিন আগে ভাড়ার জন্য ফোন দিলে জানায় তার পক্ষে ভাড়া দেয়া সম্ভব নয়। তাদের জিনিসপত্র নিয়ে যেতে বলি। তারা জানায়, সেটাও সম্ভব নয়। জানিয়ে দেয় এগুলো বিক্রি করে ভাড়া নিয়ে নিতে।

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী টুম্পা রহমান বলেন, কয়েক মাস হলো আমরা ঢাকাতে নেই। মেস ভাড়া দেয়ার কোনো মানেই হয় না। আমরা মেসে ছিলাম ৭ জন। সবাই মিলে ওই মেসেরই ৩ রুমের ২টি ছেড়ে দিয়ে একরুমে জনিসপত্র রেখে দিয়েছি।

ওদিকে রাজধানীতে বেড়েছে সাবলেটের সংখ্যা। একটি ফেসবুক গ্রুপে দেখা যায় শেষ ২০ পোস্টের মধ্যে ১২টিই সাবলেট। পোস্ট দেয়া তানিয়া জামান বলেন, আমাদের ব্যবসার আয় কমে গেছে। ফলে ভার কমানোর জন্যই সাবলেট দেয়া। এই পোস্টে কমেন্ট করা এক ব্যক্তি বলেন, অফিস থেকে বেতন বন্ধ ৩ মাস হলো। আগে বাসা নিয়ে থাকতাম এখন সম্ভব না হওয়াতে বাধ্য হয়ে সাবলেট থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

শেওড়াপাড়ার বর্ডার বাজারের ১২৬/৪ ডি, বাসা ছেড়ে যাওয়া মো. শামীম জানান, মিরপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন তিনি। সাধারণ ছুটি চলাকালে তার অফিস বন্ধ ছিল। চলতি মাসের প্রথম দিন অফিসে যান। জানতে পারেন তিনিসহ বেশ কয়েকজনের চাকরি নেই। এরপর থেকে বিভিন্ন স্থানে চাকরির জন্য ধরনা দেন। না পেয়ে বাসা ছেড়ে দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। তিনি জানান, করোনা পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হচ্ছে। সামনের দিনে চাকরি পাবো কি-না তার নিশ্চয়তা নেই। অনেক মানুষ বেকার হয়ে গেছে। এখন গার্মেন্টেও চাকরি নেই।  ঢাবির সাবেক শিক্ষার্থী নয়ন জানান, চাকরি পাইনি। টিউশনি করে ঢাকায় চলতাম। এখন সব বন্ধ। ঢাকায় থাকতে মেস ভাড়া লাগে, খাবারের টাকা লাগে, কোথায় পাবো এতো টাকা। তাই গ্রামে চলে যাচ্ছি। আবার পরিস্থিতি ভালো হলে আসবো।  ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠিত কোচিং সেন্টারের শিক্ষক মো. আলাউদ্দিন বলেন, চাকরির টাকা আর টিউশনির টাকা দিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালোই চলছিল সংসার। করোনার কারণে সব তছনছ হয়ে গেছে। তিন মাস কোচিং বন্ধ। টিউশনি বন্ধ। কোনো আয় নেই। বাসা ভাড়া  দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তাই ভাড়া ছেড়ে গ্রামের বাড়ি যশোর চলে যাচ্ছি। ট্রাক চালক তছির মিয়া জানান, এই মাসে অনেকেই পরিবার পরিজন নিয়ে ঢাকা ছেড়ে গেছে। তিনি রাজশাহী ও আশেপাশের জেলা থেকে ট্রাকে করে আম নিয়ে ঢাকায় আসেন। যাওয়ার পথে বাসা ছাড়া ওইসব মানুষের মালামাল নিয়ে যান।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যারা ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন তাদের কোনো আয়ের উৎস নেই। সরকারের অনুদান বোধ করি তারা পাননি। আর পেলেও এই টাকায় তাদের চলা সম্ভব নয়। ফলে তারা গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের ধারণা হয়তো গ্রামে গেলে এটলিস্ট না খেয়ে মারা যাবেন না। তিনি বলেন, এ অবস্থায়  গ্রামে চাপ পড়বে। আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করে নিতে হবে তাদের। না হলে গ্রামেও তারা একই অবস্থার মুখে পড়বেন। এতেও সরকারের বা ব্যাংকের সাহায্য লাগবে। এদিকে শহরেও জরুরি কাজের জন্য লোক পাওয়া যাবে না।

অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করোনার কারণে নব্য দরিদ্র গোষ্ঠীর সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের কোনো সামাজিক সুরক্ষা নেই। নতুন মধ্যবিত্ত গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়েছিল, তারা নব্য দরিদ্রে পরিণত হবে। তিনি বলেন, তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া খুবই জরুরি।

সূত্রঃ মানবজমিন

Leave a Comment

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.