অবিচার করলে সেটা ফিরে ফিরে আসে

২০১৩ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র কোটা সংস্কার আন্দোলনে নামে। শাহবাগে মানববন্ধন করে। তাদেরকে শায়েস্তা করার জন্য হল থেকে আমাদের পাঠানো হয়। আমরা এক ঝাঁক টগবগে তরুণ শায়েস্তা করতে যাই। সঙ্গে অন্য হলের অনেক ছেলে। আমাদের দেখে আন্দোলনকারীরা ভয় পেয়ে যায়। অনেকে দৌড়ে কিংবা নীরবে রাস্তা ছাড়ে। কয়েকজনকে ধরে আমাদের কেউকেউ পিটুনি দেয়। আমাদের সাথেই ছিল ধ্রুব (ছদ্মনাম)। আমাদের হলের এক বড়ভাই আন্দোলনে যোগ দেন। তাসনিম ভাই। তাকে দেখেও আমরা কয়েকজন না দেখার ভান করি। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, তাসনিম ভাইয়ের কলার ধরে আছে ধ্রুব। ঠাস, করে তাসনিম ভাইয়ের গালে চড় মেরে বসল ধ্রুব। সঙ্গে গালি। আমাদের চোখ ছানাবড়া। ধ্রুব তখন খুবই তেজি। নিজেকে সবখানে শো’ করতে চায়। নিজেকে নিবেদিত প্রমাণ করতে মরিয়া। তার এমন কাণ্ডে থ বলে গেলাম। বললাম, “এ কী করলি তুই? উনি তো আমাদের হলের বড় ভাই। ভদ্র মানুষ। অনেকদিন থেকে চিনি। তার গালে তুই চড় দিলি?” ধ্রুব গালি দিয়ে বলে ওঠে, “শালা শিবির করে। তা না হলে কি এই আন্দোলনে আসে? কোটা সংস্কার চায়?” তাসনিম ভাইয়ের দিকে তখন তাকাতে পারিনি লজ্জায়। দেখলাম, মাথা নিচু করে চোখ ডলতে ডলতে হলের দিকে ফিরছেন। এরপর হলে আমার মুখোমুখি হলে তিনি পথ এড়িয়ে যেতেন। লজ্জা পেতেন। হুট করে একদিন দোকানের সামনে দেখা। চুপচাপ মানুষটি আমাকে না দেখার ভান করলেন। আমি পাশে গিয়ে বললাম, “ভাই”। বললেন, ও তুমি? কেমন আছ? বললাম, “ভাই রাগ করবেন না। ধ্রুব কাজটা ঠিক করেনি।” এ কথা শুনেই তিনি আনমনে হয়ে গেলেন। আমাকে ডেকে দোকানের পেছনে নিয়ে গেলেন। মুহূর্তে তার চোখ লাল হয়ে উঠল। চোখের পানি সংবরনের ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগলেন। টলমল করে উঠেছে চোখের জল। ফোটা হয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ার আগেই দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। আমি তখন নির্বাক। ভাই শুধু বললেন, “ছোট ভাইয়ের হাতে চড় খাওয়ার মতো লজ্জা পৃথিবীতে নেই। তার প্রতি আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কষ্ট নেই। আমি যে আন্দোলনে কেন গিয়েছিলাম তা তোমরা এখন বুঝবে না। তবে একসময় বুঝবে। ধ্রুবও বুঝবে। তোমরা সবাই বুঝবে।” ভাইয়ের কষ্টমাখা হৃদয় নিংড়ানো কথাগুলো আমাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। কিছুদিন পর ভাই হল ছাড়েন……



এখন ২০১৮ সাল। কেটে গেছে চার বছর। সেই ধ্রুব এখনো হলে থাকে। দেশব্যাপী কোটা সংস্কারের আন্দোলন চলছে। সেই ধ্রুবই এখন আন্দোলনে সামনের কাতারে থাকে। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তার চাকরি হয়নি। গত রাতে ছাদে গিয়ে দেখি, ধ্রুব একাকী চুপচাপ বসে আছে। চেহারায় দুশ্চিন্তার গভীর ছাপ। মনের আকাশে কালো মেঘ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আমাকে দেখে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করল। মনমরা হয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করার পর বুকের ভেতরের সব ব্যাথা উগরে দিতে থাকল। এক পর্যায়ে বলল, “২০১৩ সালের কথা তোর মনে আছে? তাসনিম ভাইয়ের কথা মনে আছে? আমি তাকে মেরেছিলাম তা মনে আছে? কোটা সংস্কার আন্দোলনের আমার একটা ছবি গতকাল পত্রিকার পাতায় এসেছে। আমি আন্দোলনের সামনের কাতারে। সেই তাসনিম ভাই ছবিটা দেখে আমাকে চিনতে পেরেছেন। ফেসবুকে খু্ঁজে ইনবক্সে আজ আমাকে নক করেছেন। লিখেছেন, “ছোট ভাই, ধ্রুব। আমি তাসনিম। নন ক্যাডারে জয়েন করেছি। পত্রিকায় তোমার আন্দোলনের ছবি দেখে অবাক হয়েছি। তবে খুশি হয়েছি। তোমাদের জন্য শুভকামনা। তোমাদের হয়তো অনেকে শিবির বলবে। তবে তোমরা শিবির না- তা আমরা জানি। তোমরা এগিয়ে যাও। শুভকামনা রইলো।ভালোবাসা নিও।” এ কথা বললে বলতে ধ্রুবর চোখ দেখি ভিজে এসেছে। চোখ লাল হয়ে উঠেছে। টলমলে আশ্রু গড়িয়ে পড়ার আগেই দেখলাম, দুই হাত দিয়ে মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। চার বছর আগে তাসনিম ভাই যেমন করেছিলেন ঠিক তেমন……

ধ্রুব শেষের দিকে হাহাকার করে শুধু এতটুকু বলল, “আমার অভিশাপ লেগেছে রে, অভিশাপ লেগেছে….। তাসনিম ভাইয়ের অভিশাপ লেগেছে…….। আমাকেও এখন অনেকে শিবির বলে অভিযোগ করে…..”



Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.